ইমরান কি সুর নরম করছেন?

যা জানা জরুরি
- কারাগার থেকে মুক্তি পেলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাবেন না ইমরান খান।
- বরং দেশের স্বার্থে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবেন তিনি—এমনই দাবি করলেন ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি।
- তাঁর এই মন্তব্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কারাগার থেকে মুক্তি পেলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাবেন না ইমরান খান। বরং দেশের স্বার্থে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবেন তিনি—এমনই দাবি করলেন ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। তাঁর এই মন্তব্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরানকে যদি কালই মুক্তি দেওয়া হয়, তা হলে দেশের ক্ষতি হয় এমন কোনও পদক্ষেপ তিনি নেবেন না। তাঁর দাবি, ইমরান উদার মনের মানুষ এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত আঘাত, ক্ষোভ ও যন্ত্রণা পাশে সরিয়ে রাখার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। অর্থাৎ, অতীতের সংঘাত ভুলে সেনাপ্রধান বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে যাওয়াই ইমরানের পথ হবে না।
শুধু ইমরানের দিক থেকেই নয়, সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের কাছ থেকেও ‘আরোগ্যের হাত’ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বুখারি। তাঁর বক্তব্যের অর্থ, পাকিস্তানের গভীর রাজনৈতিক বিভাজন কাটাতে সমঝোতার উদ্যোগ দুই পক্ষের থেকেই আসতে হবে। পিটিআইয়ের কোনও শীর্ষ নেতার মুখে সাম্প্রতিক সময়ে মুনিরকে ঘিরে এমন তুলনামূলক নরম সুর বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে।
২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পর থেকেই ইমরান ও পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়েছে। এক সময় সেনাবাহিনীর সমর্থনেই ইমরান ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই সামরিক প্রতিষ্ঠানকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বিরোধীদের দমন এবং নির্বাচনী জনাদেশকে প্রভাবিত করার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করান তিনি।
সেনাপ্রধান মুনিরকেও ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন ইমরান। পাল্টা সেনাবাহিনীর তরফে তাঁকে বিভাজন সৃষ্টিকারী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার চেষ্টা করা রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে গত কয়েক বছরে ইমরান বনাম সেনাবাহিনীর সংঘাতই পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৭৩ বছরের ইমরান। দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ এবং হিংসায় প্ররোচনা-সহ একাধিক মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা হয়েছে। কয়েকটি মামলায় সাজা স্থগিত বা বাতিল হলেও অন্য মামলাগুলির কারণে তাঁর মুক্তি এখনও আটকে রয়েছে। ইমরান ও পিটিআইয়ের অভিযোগ, তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই পরিকল্পিত ভাবে এই মামলাগুলি করা হয়েছে। সরকার ও সেনাবাহিনী অবশ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এর মধ্যেই ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। তাঁর পরিবার ও আইনজীবীদের দাবি, একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মিলছে না। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে ইসলামাবাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসককে চিকিৎসক দলের অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে আদালত।
যদিও সরকার ওই নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছে। তাদের যুক্তি, একজন বন্দিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিশেষ সুবিধা দিলে তা ভবিষ্যতে অন্য বন্দিদের ক্ষেত্রেও নজির তৈরি করবে।
এই পরিস্থিতিতেই বুখারির সমঝোতার বার্তাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। সুপ্রিম কোর্টের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্দেশের পাশাপাশি এমন বার্তা পাকিস্তানের দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বুখারি কি ইমরানের অনুমোদন নিয়েই এই বার্তা দিয়েছেন, নাকি এটি কারাগারের বাইরে থাকা পিটিআই নেতৃত্বের নিজস্ব কৌশল?
দীর্ঘ কারাবাসে ইমরানের সঙ্গে দলীয় নেতাদের যোগাযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান কতটা বদলেছে, তা নিশ্চিত ভাবে বলা কঠিন। একই সঙ্গে পিটিআইও চাপের কৌশল ছাড়ছে না। দলের বহু শীর্ষ নেতা কারাবন্দি, আত্মগোপনে অথবা দলত্যাগে বাধ্য হলেও ইমরানের মুক্তির দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচি বহাল রেখেছে তারা।
অর্থাৎ, এক দিকে সেনাবাহিনীর উদ্দেশে সমঝোতার বার্তা, অন্য দিকে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি—দুই পথই একসঙ্গে খোলা রাখছে পিটিআই। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এই দ্বৈত কৌশল কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।
শেষ পর্যন্ত ইমরানের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন কতটা সম্ভব, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সামরিক প্রতিষ্ঠানের মনোভাবের উপর। বুখারির বক্তব্য অন্তত সংঘাতের বদলে আলোচনার একটি দরজা খোলার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু ইমরান নিজে একই সুরে কথা না বলা পর্যন্ত সেনা–পিটিআই সংঘাত সত্যিই শেষের পথে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



