অর্থ ও বাণিজ্য

টাটার নেতৃত্ব বদল সঙ্কট নয়, ঐতিহ্য ও পরিচালনশৈলী নবায়নের সুযোগ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ পদে নেতৃত্বের পরিবর্তন অতীতেও বহুবার বিতর্ক, মতপার্থক্য ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
  • প্রতিটি পরিবর্তনের নেপথ্যে অবশ্য আলাদা পরিস্থিতি কাজ করেছে।
  • এন চন্দ্রশেখরন তৃতীয় মেয়াদের জন্য টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী নন—এই সিদ্ধান্ত তাই কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও একে সঙ্কট হিসেবে দেখার কারণ নেই।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ পদে নেতৃত্বের পরিবর্তন অতীতেও বহুবার বিতর্ক, মতপার্থক্য ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি পরিবর্তনের নেপথ্যে অবশ্য আলাদা পরিস্থিতি কাজ করেছে। এন চন্দ্রশেখরন তৃতীয় মেয়াদের জন্য টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী নন—এই সিদ্ধান্ত তাই কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও একে সঙ্কট হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি টাটার ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করা এবং গোষ্ঠীর পরিচালনশৈলী বদলানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

টাটা গোষ্ঠীর নথিভুক্ত সংস্থাগুলির শেয়ারহোল্ডারদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ সংস্থাই শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেগুলিতে দক্ষ নেতৃত্ব ও সুপ্রতিষ্ঠিত পরিচালন পর্ষদ রয়েছে। চন্দ্রশেখরন যে সংস্থাগুলির চেয়ারম্যান, উত্তরসূরি নির্বাচনের পরে সেখানে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব হস্তান্তর করা সম্ভব। ফলে তাঁর সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায় বড় ধরনের কোনও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা সীমিত।

নথিভুক্ত সংস্থাগুলির নিরিখে চন্দ্রশেখরনের কার্যকাল সফল। তাঁর নেতৃত্বে বহু সংস্থার ব্যবসা ও মুনাফা বেড়েছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নতুন মূলধন জোগানো হয়েছে। গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সংস্থাগুলির পারস্পরিক শেয়ার-মালিকানা কমিয়ে আটকে থাকা মূলধন মুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিন যন্ত্রাংশ এবং কৃত্রিম মেধার মতো ভবিষ্যতের ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ শুরু করেছে টাটা।

প্রধান উদ্বেগটি নথিভুক্ত সংস্থাগুলিকে ঘিরে নয়, বরং টাটা সন্সকে কেন্দ্র করে। বিমান পরিবহণ ও ডিজিটাল ব্যবসায় বিপুল লোকসান, অর্ধপরিবাহী উৎপাদনে প্রবেশের কঠিন পরীক্ষা এবং শেয়ারবাজারে নথিভুক্তি নিয়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে টানাপড়েন—নতুন চেয়ারম্যানকে এই সমস্যাগুলির মোকাবিলা করতে হবে। বিপুল বিনিয়োগ করলেই হবে না, নতুন ব্যবসাগুলিকে কত দ্রুত লাভজনক করে তোলা যায়, সেটিও বড় পরীক্ষা।

টাটা ট্রাস্টের অছি সদস্যদের মধ্যে এবং চন্দ্রশেখরনের সঙ্গে টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদের একাংশের মতবিরোধের খবর আগেই প্রকাশিত হয়েছে। সেই মতপার্থক্য তাঁর পুনর্নিয়োগের পথে প্রভাব ফেলতে পারত। তবে এ বার নেতৃত্ব বদলের প্রয়োজন কোনও না কোনও সময়ে অনিবার্যই ছিল। টাটা গোষ্ঠীর কার্যনির্বাহী পরিচালকদের জন্য নির্ধারিত অবসরের বয়সে পৌঁছতে চন্দ্রশেখরনের আর প্রায় দু’বছর বাকি। ফলে উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করা সময়ের দাবি ছিল।

নতুন চেয়ারম্যান বেছে নিতে টাটা গোষ্ঠীর হাতে প্রায় ছ’মাস সময় রয়েছে। সাধারণ ভাবে ভারতীয় আইনে উত্তরাধিকার পরিকল্পনার দায়িত্ব থাকে মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি এবং পরিচালন পর্ষদের হাতে। কিন্তু টাটা সন্সের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ নির্বাচন কমিটি গঠন করতে হয়। স্যর দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট এবং স্যর রতন টাটা ট্রাস্ট যৌথভাবে তিন জন সদস্য মনোনীত করে। টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ থেকে থাকেন এক জন এবং পঞ্চম সদস্য হন স্বাধীন বহিরাগত। কমিটির চেয়ারম্যানও ট্রাস্টের মনোনীত সদস্যদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠকে ট্রাস্টের প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

উত্তরসূরির যোগ্যতা নির্ধারণই সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাঁকে কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র, বিভিন্ন মন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী পরিচালনার দক্ষতা এবং হিসেব করে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাও প্রয়োজন। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যে টাটার মতো বহুমুখী গোষ্ঠীকে পরিচালনা করতে হলে একই সঙ্গে স্থিরতা ও সাহস দেখাতে হবে। এমন প্রার্থী খুঁজে পাওয়া নির্বাচন কমিটির পক্ষেও সহজ নয়।

টাটা গোষ্ঠীর মালিকানা কাঠামো অন্য শিল্পগোষ্ঠীগুলির তুলনায় স্বতন্ত্র। জনকল্যাণমূলক ট্রাস্টগুলি এখানে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। এই কাঠামো গোষ্ঠীটিকে সামাজিক দায়িত্বের বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি-নির্ভরতা অতিক্রম করে দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে অভিজ্ঞ পেশাদারদের উপর আস্থা রাখতেই হবে। টাটা সন্সের কার্যনির্বাহী নেতৃত্ব ও পরিচালন পর্ষদে স্বাধীন, দক্ষ পেশাদারদের জায়গা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোষ্ঠীর দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের দর্শনও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

তার জন্য নতুন চেয়ারম্যানের ক্ষমতা, দায়িত্ব, কাজের পরিধি এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ জরুরি। টাটা ট্রাস্ট, টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ এবং চেয়ারম্যানের মধ্যে সম্পর্কেও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি অস্পষ্ট হলে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ব্যক্তিগত সংঘাতের রূপ নিতে পারে।

টাটা সন্সকে তার যোগাযোগের ধরনও বদলাতে হবে। সমাজমাধ্যমের যুগে বিতর্কের মুখে দীর্ঘ নীরবতা আর গ্রহণযোগ্য কৌশল নয়। গোষ্ঠীর বক্তব্য না থাকলে অন্যরা জনপরিসরের আখ্যান নিয়ন্ত্রণ করে। এতে সুশাসন, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সামাজিক অবদানের জন্য পরিচিত টাটা-ব্র্যান্ডের ক্ষতি হয়। স্বচ্ছ ও সময়োচিত যোগাযোগ তাই নতুন নেতৃত্বের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

চন্দ্রশেখরনের বিদায় তুলনামূলকভাবে কম সংঘাতপূর্ণ হলেও তাঁর উত্তরসূরি কঠিন উত্তরাধিকার পাবেন। তাঁকে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য মেটাতে হবে, গোষ্ঠীর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং পুরনো ব্যবসার স্থিতি বজায় রেখে নতুন ক্ষেত্রকে লাভজনক করে তুলতে হবে। সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচন করা গেলে এই পরিবর্তন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য টাটা গোষ্ঠীর উত্তরাধিকার নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার পথ খুলে দেবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles