Home খবরআন্তর্জাতিক ‘জেলের মতো বন্দি’: ফেব্রুয়ারি থেকে উপসাগরে আটকে হাজার হাজার নাবিক, অধিকাংশই ভারতীয় ও ফিলিপিনো

‘জেলের মতো বন্দি’: ফেব্রুয়ারি থেকে উপসাগরে আটকে হাজার হাজার নাবিক, অধিকাংশই ভারতীয় ও ফিলিপিনো

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
4 views 5 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের সঙ্গে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের জেরে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছেন হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিক। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে এই সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এখনও প্রায় ৫০০টি জাহাজে ৬ হাজার নাবিক আটকে রয়েছেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা। তাঁদের বড় অংশই ভারতীয় ও ফিলিপিনো বলে মনে করা হচ্ছে। কবে তাঁরা এই বিপজ্জনক অঞ্চল ছেড়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

সোমবার গভীর রাতে হরমুজ প্রণালীতে একটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে আতঙ্কিত নাবিকেরা বিপদসংকেত পাঠান। ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তরে গ্রিক মালিকানাধীন, লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ জাহাজটিতে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনও প্রক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। তার জেরে ইঞ্জিনকক্ষে বিদ্যুৎ চলে যায় এবং নাবিকদের থাকার অংশে আগুন ধরে যায়।

নাবিকেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি কাছাকাছি থাকা অন্য জাহাজগুলির কাছে সাহায্য চান। মঙ্গলবার সকালে তাঁরা জাহাজ ছেড়ে বেরোতে পারলেও দেখা যায়, তৃতীয় প্রকৌশলী নিখোঁজ। কয়েক দিন পরেও তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি।

ব্রিটেনের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা কেন্দ্র ঘটনাটির তদন্ত করছে। প্রক্ষেপণাস্ত্রটি কোথা থেকে এসেছিল, তা এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ঠিক এই এলাকায় অতীতে যে ধরনের সামরিক হামলা হয়েছে, সেগুলির উৎস ছিল ইরান। যদিও ইরান এ ক্ষেত্রে নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এর আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওই অঞ্চলে আরও দু’টি জাহাজ—একটি বড় এবং একটি মাঝারি আকারের তেলবাহী জাহাজ—অল্পের জন্য হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলি আবারও সামনে এনেছে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা হাজার হাজার নাবিকের বিপদের কথা। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে উপসাগরে ঢোকার সময় এই নাবিকেরা ভেবেছিলেন, এটি আর পাঁচটি সমুদ্রযাত্রার মতোই হবে। কিন্তু সেই স্বাভাবিক যাত্রাই এখন দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং মানসিক ভাবে বিপর্যয়কর অপেক্ষায় পরিণত হয়েছে।

ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রাখায় এক সময়ে প্রায় ২০ হাজার নাবিক সপ্তাহের পর সপ্তাহ আটকে পড়েছিলেন। যুদ্ধের প্রথম দিকে উপসাগরে আটকে থাকা এক নাবিক জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে তাঁদের জাহাজের এক সহকর্মী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, নাবিকদের মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৭ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে ইরানি হামলায়।

মাঝে কয়েক বার আটকে পড়া নাবিকদের মনে আশা তৈরি হয়েছিল যে তাঁরা হয়তো বেরিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু প্রতিবারই সেই আশা ভেঙেছে। এপ্রিলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি এবং জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি—দুটিই ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়ে।

জুনের সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের পর সাময়িক ভাবে তৈরি হওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে কয়েক ডজন তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বেরিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু সব জাহাজ সেই সুযোগ পায়নি।

রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এখনও প্রায় ৫০০টি বিভিন্ন ধরনের জাহাজে ৬ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরে আটকে রয়েছেন।

সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডমিনগেজ বলেছেন, এই মানুষগুলি সম্পূর্ণ নিরপরাধ। তাঁরা জাহাজ চালানো এবং বাণিজ্যিক কাজের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, যুদ্ধ করার নয়। তাঁদের জাহাজগুলিও ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা ঠেকানোর উপযোগী করে তৈরি হয়নি।

ভারতের অন্যতম সামুদ্রিক শ্রমিক সংগঠন মেরিটাইম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার সাধারণ সম্পাদক স্যাভিও রামোস আটকে থাকা নাবিকদের পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘জেলের মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর কথায়, জাহাজে থাকা মানুষগুলির সামনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই পরিস্থিতি শেষ হবে কবে? দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তা তাঁদের উপর প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বড় তেলবাহী জাহাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রামোস বলেন, “এ যেন কাউকে জেলে ঢুকিয়ে তার চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। আপনি জানেন না কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন। একটা সময়ের পরে এই পরিস্থিতি আপনার উপর প্রভাব ফেলবেই।”

দায়িত্বশীল মালিকানাধীন অধিকাংশ জাহাজে অবশ্য ছোট নৌকায় করে উপকূল থেকে নিয়মিত পানীয় জল, খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিপজ্জনক অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও পথ অধিকাংশ নাবিকের কাছেই নেই।

রামোস জানিয়েছেন, তাঁদের সংগঠনের কিছু সদস্য বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন এবং তাঁদের ফেরানো সম্ভব হয়েছে। তবে তার জন্য শর্ত ছিল—তাঁদের জায়গায় দায়িত্ব নিতে অন্য কোনও অভিজ্ঞ আধিকারিককে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে প্রবেশ করতে রাজি হতে হবে।

ওমানের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা চলছে। হরমুজ প্রণালীর একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমান। কিন্তু প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রণালী দিয়ে পারস্য উপসাগরে ঢোকা জাহাজের চলাচলের উপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাহাজমালিক এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য মহলে এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ যুদ্ধের আগে এই জলপথে আন্তর্জাতিক জাহাজের অবাধ চলাচলের নীতি কার্যকর ছিল।

শান্তিচুক্তি ভেঙে পড়ার পর আবার জাহাজে হামলা শুরু হলেও হরমুজ দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল করছে। তবে সেই সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম।

লয়েডস লিস্ট-এর হিসাব অনুযায়ী, ২৭ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৫২টি ইরানের সঙ্গে সম্পর্কহীন জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ উপসাগর থেকে বেরিয়েছে এবং ৪০ শতাংশ প্রবেশ করেছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্ত আরও ৩২টি জাহাজ প্রণালী পার হয়েছে।

অর্থাৎ এক সপ্তাহে মোট ৮৪টি জাহাজ চলাচল করেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৭০০টি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত, সেখানে বর্তমান সংখ্যা তার সামান্য ১০ শতাংশের কিছু বেশি।

লয়েডস লিস্ট-এর বিশ্লেষণ বলছে, মূলধারার আন্তর্জাতিক সংস্থার মালিকানাধীন অন্তত ৭০টি বড় তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ ফেব্রুয়ারি থেকে উপসাগরে আটকে রয়েছে। এগুলির মালিকদের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও নেই। জুনের সমঝোতার ঘোষণা শুনে আরও ৬৫টি তেলবাহী জাহাজ ওই অঞ্চলে ঢুকেছিল। পরে তারা বুঝতে পারে, বেরিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

আটকে থাকা নাবিকদের মধ্যে কোন দেশের কত জন রয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তবে সবচেয়ে বড় দুই গোষ্ঠী ভারতীয় ও ফিলিপিনো বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বের বাণিজ্যিক নৌপরিবহণে নাবিক সরবরাহকারী দেশগুলির মধ্যে ভারত দ্বিতীয়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৩ লক্ষ ১২ হাজার ভারতীয় এই পেশায় যুক্ত। প্রথম স্থানে ফিলিপিন্স—সেখানকার প্রায় ৪ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণ শিল্পে কাজ করেন।

ইরান যুদ্ধের বিপদ এখন শুধু পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ নেই। সংঘর্ষ ছড়িয়েছে লোহিত সাগর এবং ইরাক-সংলগ্ন এলাকাতেও। অন্য দিকে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জাহাজে হামলা বাড়িয়েছে। জুলাইয়ের শুরু থেকে সেখানে অন্তত ২৪ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। লয়েডস-এর বিশ্লেষকেরা সেই কারণেই জুলাইকে বাণিজ্যিক নাবিকদের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাসগুলির একটি’ বলে বর্ণনা করেছেন।

আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণ শিল্পের সামনে এখন আরও একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান সংঘাত যত দীর্ঘ হবে এবং বিপজ্জনক এলাকায় নাবিকদের যত বেশি সময় আটকে থাকতে হবে, ভবিষ্যতে তত কম মানুষ এই ধরনের এলাকায় জাহাজ নিয়ে যেতে রাজি হবেন। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রযাত্রার পেশা বেছে নেওয়ার আগ্রহও কমতে পারে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব ডমিনগেজ সতর্ক করেছেন, এর প্রভাব শুধু নাবিক বা জাহাজমালিকদের উপর পড়বে না। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহণ করা হয়। নাবিক না থাকলে সেই পণ্য গন্তব্যে পৌঁছবে না। শেষ পর্যন্ত তার অভিঘাত পড়বে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপর।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles