বাংলাস্ফিয়ার: প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী, বিশিষ্ট ওড়িশি নৃত্যশিল্পী ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল কলকাতায়। গত কয়েক মাস ধরে সৌরভের নামে একাধিক হুমকি-চিঠি আসছিল বলে অভিযোগ। প্রথম দিকে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া না হলেও সোমবার তাঁর দফতরে পৌঁছনো দু’টি চিঠিতে সৌরভ ও ডোনাকে সরাসরি খুন করার হুমকি দেওয়ার পর পুলিশের দ্বারস্থ হন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক। কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, উত্তর ২৪ পরগনার বেলঘরিয়া এলাকার কোনও ব্যক্তির সঙ্গে ওই চিঠিগুলির যোগ থাকতে পারে।
বর্তমানে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের সভাপতি সৌরভের তরফে ঠাকুরপুকুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রায় ছ’মাস ধরে তাঁর নামে বিভিন্ন ধরনের চিঠি আসছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, সেগুলির কয়েকটিতে হুমকির ভাষা থাকলেও প্রথম দিকে সৌরভ বা তাঁর দফতর বিষয়টিকে গুরুতর বিপদ বলে মনে করেননি। কিন্তু সোমবার পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁর কলকাতার দফতরে একই দিনে দু’টি চিঠি আসে। সেখানে শুধু সৌরভ নন, তাঁর স্ত্রী ডোনাকেও খুন করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এমনকি তাঁদের ঘনিষ্ঠ কয়েক জনের ক্ষতি করার কথাও লেখা হয়েছে। এর পরেই সৌরভের ম্যানেজারের মাধ্যমে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, হুমকির উৎস খুঁজে বার করতে চিঠিগুলির পাশাপাশি সেগুলি কী ভাবে পাঠানো হয়েছিল, সেই পথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের অন্যতম লক্ষ্য হল, গত ছ’মাসে আসা সমস্ত চিঠি একই ব্যক্তি পাঠিয়েছেন কি না তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কী কারণে সৌরভ ও তাঁর পরিবারকে নিশানা করা হচ্ছে, তারও উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে একটি কুরিয়ার সংস্থার মাধ্যমে চিঠি পাঠানোর সূত্র পাওয়া গিয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, উত্তর ২৪ পরগনার বেলঘরিয়া এলাকার কোনও ব্যক্তি এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা বলেছে পুলিশ। চিঠি পাঠানোর সময়ে ব্যবহৃত তথ্যপত্র, প্রেরকের পরিচয় এবং যোগাযোগের নম্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে। একটি মোবাইল নম্বরও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। সেই নম্বরের অবস্থান এবং তার সঙ্গে যুক্ত সিম কার্ডের গতিবিধি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তে কলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স এবং নিরাপত্তা অধিকর্তার দফতরও সক্রিয় হয়েছে বলে অন্য একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তদন্তকারীরা সৌরভদের বেহালার বাড়ি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরের একটি জায়গা চিহ্নিত করেছেন, যেখান থেকে হুমকি-চিঠি পাঠানো হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ। সেখানে তল্লাশিও শুরু হয়েছে।
তবে পুলিশ এখনও প্রকাশ্যে কোনও ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করেনি। বেলঘরিয়ার সূত্রটিও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্যিই চিঠির প্রেরক কি না, কিংবা তাঁর সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগ রয়েছে কি না—সবটাই যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা বিশেষ ভাবে জানতে চাইছেন, চিঠিগুলির পিছনে কোনও ব্যক্তিগত আক্রোশ রয়েছে, না কি অন্য কোনও উদ্দেশ্য কাজ করছে।
সৌরভের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রাক্তন ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে এই ধরনের হুমকি স্বাভাবিক ভাবেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভারতীয় দলের অন্যতম সফল অধিনায়ক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রাক্তন সভাপতি। বর্তমানে বাংলার ক্রিকেট প্রশাসনেরও শীর্ষ পদে রয়েছেন। অন্য দিকে ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় নিজেও সুপরিচিত নৃত্যশিল্পী। ফলে একই সঙ্গে দু’জনকে খুনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে নিছক উড়ো চিঠি হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
এর আগে ২০১৭ সালেও সৌরভ একটি হুমকি-চিঠি পেয়েছিলেন। সে সময় তাঁকে একটি অনুষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান ঘটনার সঙ্গে সেই পুরনো ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে—এমন তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
তদন্তের মূল ভরকেন্দ্র এখন কুরিয়ার সংস্থার নথি এবং মোবাইল নম্বর। চিঠি বুক করার সময় কে উপস্থিত ছিলেন, প্রেরকের নাম-ঠিকানা সত্যি কি না, কোনও নজরদারি ক্যামেরার ছবি পাওয়া যায় কি না এবং ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি কার নামে—এই সমস্ত তথ্য মিলিয়ে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অবশ্য হুমকির উদ্দেশ্য। কেন টানা কয়েক মাস ধরে সৌরভের কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছিল এবং কেন সর্বশেষ চিঠিতে তাঁর স্ত্রীকেও নিশানা করা হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ সেই উদ্দেশ্য চিহ্নিত করার পাশাপাশি সৌরভ ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তদন্ত এগোলে হুমকির পিছনে এক জন ব্যক্তি, না কি আরও বড় কোনও যোগসূত্র রয়েছে, তা পরিষ্কার হতে পারে।