ধর্ষণ চাপা দিতে গর্ভপাত? ডাক্তারের জামিন বাতিল

যা জানা জরুরি
- ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দিতে এক তরুণীর গর্ভপাত করানো এবং প্রমাণ লোপাটে সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত এক চিকিৎসকের জামিনের আবেদন খারিজ করল গুজরাত হাই কোর্ট।
- আদালতের পর্যবেক্ষণ, যে পরিস্থিতিতে গর্ভপাত করানো হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে চিকিৎসকের ভূমিকা আলাদা করে দেখা যায় না।
- তরুণীর বাবা গুজরাত হাই কোর্টে একটি বন্দিপ্রত্যক্ষীকরণ মামলা করেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দিতে এক তরুণীর গর্ভপাত করানো এবং প্রমাণ লোপাটে সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত এক চিকিৎসকের জামিনের আবেদন খারিজ করল গুজরাত হাই কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যে পরিস্থিতিতে গর্ভপাত করানো হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে চিকিৎসকের ভূমিকা আলাদা করে দেখা যায় না।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের জানুয়ারিতে। তরুণীর বাবা গুজরাত হাই কোর্টে একটি বন্দিপ্রত্যক্ষীকরণ মামলা করেন। তাঁর দাবি ছিল, ২০২৫ সালের জুন থেকে মেয়ে নিখোঁজ এবং এক ব্যক্তি তাঁকে বেআইনি ভাবে আটকে রেখেছেন। এই ধরনের মামলায় নিখোঁজ বা বেআইনি ভাবে আটক ব্যক্তিকে খুঁজে আদালতের সামনে হাজির করার নির্দেশ চাওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত তরুণীকে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চের সামনে তাঁর দেওয়া বয়ানে মামলাটি নেয় সম্পূর্ণ অন্য মোড়। ১৫ জানুয়ারির নির্দেশে আদালত জানায়, অভিযোগগুলি সত্যি হলে তা ‘মর্মান্তিক’।
বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
তরুণীর অভিযোগ, সুরাতে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকার সময় বাড়ির মালিক তাঁকে যৌন নির্যাতন করেন। এর পর তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন বলে দাবি তাঁর।
তাঁর আরও অভিযোগ, বাবা-মা বাড়িওয়ালার সঙ্গে যোগসাজশ করে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের গর্ভাবস্থায় তাঁকে গর্ভপাত করাতে নিয়ে যান। মুখ বন্ধ রাখার বিনিময়ে বাড়িওয়ালা তাঁর বাবা-মাকে পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তরুণী।
তবে বাবা যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মেয়েকে আটকে রাখার অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর সম্পর্কে মেয়ের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তরুণী জানান, বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে চেয়ে তিনিই ওই ব্যক্তির সাহায্য চেয়েছিলেন। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে ওই ব্যক্তি তাঁকে বাড়ি ছাড়তে সাহায্য করেন এবং পরে তাঁর পাশে ছিলেন।
তরুণীর বয়ান সামনে আসার পর যৌন নির্যাতন, গর্ভপাত এবং কথিত টাকা লেনদেনের বিষয়ে ‘সার্বিক তদন্তের’ নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।
কেন কাঠগড়ায় চিকিৎসক?
এর পর গর্ভপাত করানোর অভিযোগে অভিযুক্ত চিকিৎসকের নিয়মিত জামিনের আবেদন ওঠে বিচারপতি এইচ ডি সুথারের এজলাসে। চলতি মাসের গোড়ায় সেই আবেদন খারিজ করে আদালত জানায়, অন্তত এই পর্যায়ে পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে চিকিৎসকের ভূমিকা আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়।
সরকারি পক্ষের অভিযোগ, চিকিৎসক ‘প্রমাণ নষ্ট ও মুছে ফেলায় সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছিলেন’। তরুণীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, চিকিৎসা এবং গর্ভপাতের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করা হয়নি বা তদন্তকারীদের দেওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ।
আদালতের নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, একটি বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে এক মহিলার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ ঘটেছিল বলে অভিযোগ এবং পরে পুলিশ ও তাঁর বাবা-মা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে তদন্ত থেকে বাদ দেওয়া যায় না।
১৫ জানুয়ারির বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে আদালত আরও জানায়, ওই ঘটনায় ‘অর্থ ও পেশিশক্তি’র উপরে ‘বিচারবোধের’ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
‘শুধু চিকিৎসা করেছি’, দাবি ডাক্তারের
অভিযুক্ত চিকিৎসক অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
চিকিৎসকের আইনজীবীর বক্তব্য, কথিত যৌন নির্যাতনের ঘটনায় তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না। বাবা-মা এবং আরও কয়েক জন তরুণীকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর তিনি কেবল চিকিৎসক হিসেবে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কোনও ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকা বা প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
এর পাল্টা সরকারি পক্ষের যুক্তি, রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা, তাঁর চিকিৎসা, এমনকি অচেতন করার ওষুধ প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির নথি সংরক্ষণ করা চিকিৎসকের পেশাগত দায়িত্ব। অথচ মামলার গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-নথি পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজ্যের দাবি, নথির এই অনুপস্থিতিও প্রমাণ চাপা দেওয়ার বৃহত্তর চেষ্টার অংশ হতে পারে।
নাবালিকা কি না, উঠল সেই প্রশ্নও
মামলায় তরুণীর বয়স নিয়েও জটিলতা রয়েছে। তাঁর বাবা প্রথমে তাঁকে নাবালিকা বলে দাবি করেছিলেন। পরে পাওয়া তথ্যে ইঙ্গিত মেলে, ঘটনার সময়ে তাঁর বয়স ১৮ বছর ছিল।
হাই কোর্ট জানিয়েছে, যৌন অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা আইন বা পকসোর বিধান এই মামলায় প্রযোজ্য কি না, তা বিচারপ্রক্রিয়ার সময় নির্ধারণ করা হবে।
বন্দিপ্রত্যক্ষীকরণ মামলার নির্দেশে ডিভিশন বেঞ্চ আরও বলেছিল, অভিযোগগুলি সত্যি হলে তরুণীর বাবার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আদালতের নজরে আসে, মেয়ের যৌন নির্যাতন বা গর্ভপাতের মতো গুরুতর অভিযোগের কথা বাবা তাঁর মূল আবেদনে উল্লেখ করেননি।
আদালতের হস্তক্ষেপে বদলাল তদন্তের মোড়
তরুণী আদালতকে জানিয়েছিলেন, তিনি বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে চান না। তাই ১৫ জানুয়ারির নির্দেশে তদন্ত চলাকালীন তাঁকে মেয়েদের একটি শিশু নিবাসে রাখার ব্যবস্থা করতে বলে আদালত। পরে তাঁকে মহিলাদের আশ্রয়কেন্দ্র ‘নারী সুরক্ষা গৃহ’-এ স্থানান্তরিত করা হয়।
হাই কোর্টের নির্দেশে শুরু হওয়া তদন্তের ভিত্তিতে পরে এফআইআর দায়ের হয়। চিকিৎসক-সহ একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে মামলাটি এখনও বিচারাধীন। তরুণীর অভিযোগ, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রমাণ নষ্টের দাবি এবং অন্য অভিযুক্তদের ভূমিকা—কোনোটিই আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত হয়নি। জামিন খারিজ হওয়াও অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়।
এই মামলায় আদালতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে অপরাধী, তা নয়—একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পর সেটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, আর হয়ে থাকলে তার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



