খবর

শিক্ষকরাই যখন ‘শুল্ড’ লেখেন!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • শুধু পড়ুয়ারাই নয়, পঞ্জাবের সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের একাংশও ইংরেজির অতি সাধারণ শব্দের বানান লিখতে গিয়ে ভুল করেন।
  • ‘Should’ হয়ে যায় ‘shuld’, ‘vacant’ লেখা হয় ‘vacent’, আর ‘eight’ বদলে যায় ‘eaght’!
  • ঘটনাগুলি নিছক বিচ্ছিন্ন ভুল নয়—এর পিছনে রয়েছে সরকারি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ইতিহাস।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

শুধু পড়ুয়ারাই নয়, পঞ্জাবের সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের একাংশও ইংরেজির অতি সাধারণ শব্দের বানান লিখতে গিয়ে ভুল করেন। ‘Should’ হয়ে যায় ‘shuld’, ‘vacant’ লেখা হয় ‘vacent’, আর ‘eight’ বদলে যায় ‘eaght’! ঘটনাগুলি নিছক বিচ্ছিন্ন ভুল নয়—এর পিছনে রয়েছে সরকারি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ইতিহাস।

সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি শিক্ষামূলক চার্টের ছবিতে একাধিক বানান ভুল সামনে আসতেই বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে। আম আদমি পার্টি সরকারের ‘শিক্ষা ক্রান্তি’ বা শিক্ষা বিপ্লবের সাফল্য তুলে ধরতে ছবিগুলি প্রকাশ করেছিলেন পঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী হরজোৎ সিংহ বেইন্স। নীতি আয়োগের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেছিলেন, বিদ্যালয় শিক্ষায় কেরলকে পিছনে ফেলে দেশের শীর্ষে উঠে এসেছে পঞ্জাব।

কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার ছবিটা যে এতটা উজ্জ্বল নয়, তার প্রমাণ মেলে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের নানা ঘটনায়।

২০১৫-র ‘ইংরেজি পরীক্ষা’

২০১৫ সালে পঞ্জাবের দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ৮০ হাজারেরও বেশি পড়ুয়া ইংরেজিতে ফেল করেছিল। পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা বোঝাতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী দলজিৎ সিংহ চিমা ইংরেজি শিক্ষকদেরই একটি পরীক্ষা নিয়েছিলেন।

সেখানেই প্রকাশ্যে আসে শিক্ষকদের ইংরেজি দক্ষতার দুর্বলতা। ‘vacant’-এর বদলে ‘vacent’, ‘should’-এর বদলে ‘shuld’, ‘lack’-এর বদলে ‘lake’ এবং ‘eight’-এর বদলে ‘eaght’ লিখেছিলেন অনেকে।

শুধু বানানেই নয়, সাধারণ ইংরেজি বাক্য গঠনেও হোঁচট খেয়েছিলেন শিক্ষকরা। পড়ুয়াদের খারাপ ফলের কারণ ব্যাখ্যা করে একটি অনুচ্ছেদ লিখতে বলা হলে এক শিক্ষক লিখেছিলেন, “It class was very weak class from 6 by chance.” বাক্যটির অর্থ উদ্ধার করাই কার্যত কঠিন।

দু’শোর বেশি শিক্ষকের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া কেউ ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দে কথোপকথন চালাতে পারেননি।

অবশ্য ব্যর্থতার ব্যাখ্যাও কম বিচিত্র ছিল না। কেউ বলেছিলেন, লিখতে গিয়ে তাঁরা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কারও দাবি, চশমা বাড়িতে ফেলে এসেছিলেন। আবার কেউ পড়ুয়াদের গ্রামীণ পটভূমিকেই খারাপ ফলের জন্য দায়ী করেছিলেন।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৬ সালে ইংরেজিতে ফেল করা পড়ুয়ার সংখ্যা কমাতে পঞ্জাব স্কুল শিক্ষা পর্ষদ পরীক্ষায় ২৫ থেকে ৩০ নম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০০৭-এর আগে ইংরেজি শিক্ষকই নেই!

সমস্যার শিকড় অবশ্য আরও গভীরে। ২০০৭ সাল পর্যন্ত পঞ্জাবে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনও পদশ্রেণিই ছিল না। ফলে ইংরেজিতে বিশেষ দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও সমাজবিদ্যা, এমনকি পঞ্জাবি ভাষার শিক্ষকদেরও ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি পড়াতে হত।

রাজ্যের সরকারি স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণত একজন শিক্ষকই সব বিষয় পড়ান। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং একাদশ-দ্বাদশে প্রভাষকেরা পড়ান।

২০০৭-০৮ সালে প্রথম বার ইংরেজির জন্য প্রায় এক হাজার শিক্ষকপদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পান প্রায় ৮০০ জন। প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা ছিল যথেষ্ট কম। এখনও বহু সরকারি স্কুলে ইংরেজির পৃথক শিক্ষক নেই; অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়েই কাজ চালাতে হয়।

২০১০ সালে পঞ্জাব সরকার হাই কোর্টে জমা দেওয়া এক হলফনামায় বিষয়টি কার্যত স্বীকারও করে। সরকার জানায়, ২০০৭ সালের আগে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগের কোনও পৃথক সংস্থান ছিল না। ১৯৭৮ সালের পঞ্জাব রাজ্য শিক্ষা তৃতীয় শ্রেণির বিদ্যালয় শিক্ষকবর্গের চাকরিবিধিতে পঞ্জাবি, হিন্দি, সংস্কৃত, উর্দু, গণিত ও সমাজবিদ্যার শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা থাকলেও ইংরেজির কোনও উল্লেখ ছিল না।

এই ব্যবস্থার ফল কতটা অস্বস্তিকর হতে পারে, তার আরেকটি উদাহরণ মেলে ২০১৬ সালে। এক ইতিহাস শিক্ষক তাঁকে জোর করে ইংরেজি পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর যুক্তি ছিল, “আমার মূল বিষয় ইতিহাস। আমি কী করে ইংরেজি পড়াব? পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করা যায় না।”

ইংরেজি এল, তবে বেশ দেরিতে

প্রাথমিক স্তরেও ইংরেজির প্রবেশ ঘটেছিল বেশ দেরিতে। প্রবীণ শিরোমণি অকালি দল নেতা তথা প্রয়াত প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী তোতা সিংহের সময়ে ১৯৯৯-২০০০ সালে প্রথম শ্রেণি থেকেই ইংরেজি পড়ানো শুরু হয়। তার আগে সরকারি স্কুলে ইংরেজি শেখানো শুরু হত ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে।

ফলে প্রাথমিক স্তরে ইংরেজির যে ভিত তৈরি হওয়ার কথা, বহু প্রজন্মের পড়ুয়ার ক্ষেত্রেই তা তৈরি হয়নি। আর সেই ঘাটতির প্রভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও থেকে গিয়েছে।

পরিবর্তনের চেষ্টা, প্রশ্নও

২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর আম আদমি পার্টি সরকার পরিস্থিতি বদলানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে। নতুন ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং মার্কিন দূতাবাসের আঞ্চলিক ইংরেজি ভাষা দফতরের সঙ্গে কাজ করছে শিক্ষা দফতর।

ইংরেজিভাষী দেশে পড়াশোনা বা কাজের জন্য পঞ্জাবের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রতি বছর আইইএলটিএস পরীক্ষা দেন। সেই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের ইংরেজিতে বলা, লেখা এবং শুনে বোঝার দক্ষতা বাড়াতেও বিশেষ পাঠক্রম চালু হয়েছে।

তবে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতি নিয়ে বিতর্ক এখনও কাটেনি।

২০২৪-এ ফের প্রশ্নের মুখে নীতি

২০২৪ সালে পঞ্জাবের শিক্ষা দফতর ৩০১ জন শিক্ষককে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ইংরেজি পড়ানোর জন্য প্রভাষক পদে উন্নীত করে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ২৯৮ জনই এসেছিলেন অন্য বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে। ইংরেজিতে তাঁদের বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাগত পটভূমি ছিল না।

অধিকাংশই স্নাতক স্তরে ইংরেজিকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পড়েননি। এমনকি শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ বা বিএড-এর সময়ও ইংরেজি তাঁদের শিক্ষণবিষয় ছিল না। পরে দূরশিক্ষার মাধ্যমে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে তাঁরা পদোন্নতি পান।

এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেন ইংরেজির শিক্ষক পদপ্রার্থীরা। তাঁদের দাবি, অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের ইংরেজির প্রভাষক করার আগে অন্তত একটি যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা নেওয়া উচিত ছিল।

পঞ্জাবের ইংরেজি শিক্ষক পদপ্রার্থীদের সংগঠনের প্রতিনিধি হরপিন্দর সিংহ ধিলোঁর কথায়, কয়েক দশকের অবহেলা কয়েক বছরের মধ্যে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তাঁর প্রশ্ন, “একটি ভাষার শিক্ষকদের জন্য কখনও পৃথক পদশ্রেণিই ছিল না—এটা ভাবা যায়?”

ধিলোঁ জানান, ২০০৭ সালে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ শুরু হলেও তাঁদের জন্য আলাদা চাকরিবিধি ছিল না। ২০১৬ সালে শিক্ষকরা হাই কোর্টে যাওয়ার পরেই ইংরেজি শিক্ষকদের জন্য চাকরিবিধি তৈরি হয়।

তাঁর মতে, প্রাথমিক স্তরে সমস্যা আরও গভীর। কারণ, যে শিক্ষকদের ইংরেজির ভিতই দুর্বল, তাঁরাই আবার পরবর্তী প্রজন্মকে সেই ভাষা শেখাচ্ছেন। ধিলোঁর কথায়, “যাঁদের কাছে তাঁরা পড়েছেন, সেই শিক্ষকেরাও তাঁদের সময়ে ইংরেজির শিক্ষক পাননি।”

অর্থাৎ, পঞ্জাবের ইংরেজি শিক্ষার সমস্যা শুধু ‘শুল্ড’ আর ‘ভেসেন্ট’-এর ভুল বানানে আটকে নেই। এটি এক দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত ঘাটতি—যার প্রভাব শিক্ষক থেকে পড়ুয়া, এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন প্রশ্ন, ‘শিক্ষা ক্রান্তি’ সেই পুরনো চক্রটা সত্যিই ভাঙতে পারছে কি না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles