ক দিকে পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল ভবন, সীমান্তের প্রবেশপথ, সড়ক এবং উপত্যকার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদী। অন্য দিকে প্রায় একই জায়গাজুড়ে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ। নেপাল–তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের আগে ও পরের আকাশচিত্রে উঠে এসেছে গিরং স্থলবন্দরের বিপর্যস্ত চেহারা। কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যেই বোঝা যাচ্ছে, পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল স্রোত কীভাবে বদলে দিয়েছে একটি সীমান্তকেন্দ্রের পরিচিত ভূগোল।

এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনা উদ্ধারকারীদের হেলিকপ্টার থেকে তোলা দৃশ্যের সঙ্গে বিপর্যয়ের আগের ছবি মিলিয়ে এই তুলনামূলক ভিডিয়ো প্রকাশিত হয়েছে। আট সেকেন্ডের দৃশ্যটির প্রথম অংশে দেখা যায় অক্ষত বন্দর এলাকা। চিনের জাতীয় প্রতীক লাগানো প্রধান সীমান্ত ভবন, আশপাশের বহুতল, রাস্তা এবং সবুজ পাহাড়ি ঢাল স্পষ্ট। পরবর্তী অংশে সেই এলাকার বড় অংশই ধূসর, ধ্বংসাবশেষে ঢাকা। বহু নির্মাণ মাটিচাপা পড়েছে অথবা স্রোতে ভেসে গিয়েছে বলে ছবির বিবরণে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

তবে এই তুলনামূলক ভিডিয়োর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস। ফলে দৃশ্যটির প্রতিটি অংশকে পৃথক যাচাই ছাড়াই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা উচিত নয়।

গিরং কোনও সমুদ্রবন্দর নয়; এটি নেপাল ও চিনের মধ্যে স্থলপথে যোগাযোগের সীমান্তকেন্দ্র। কাঠমান্ডু ও লাসাকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হিমালয়-পথের এই অংশে বিপর্যয় ঘটায় যাতায়াত এবং উদ্ধার—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বন্যায় সীমান্ত পারাপারের কেন্দ্রটি কার্যত বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছনোর কাজ চালাচ্ছেন দুই দেশের উদ্ধারকারীরা। নিখোঁজদের মধ্যে কৈলাসগামী হিন্দু ও বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীও রয়েছেন।

চিনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য উদ্ধৃত করে এনডিটিভি জানিয়েছে, বন্দরের আশপাশে জমে থাকা কাদার গড় গভীরতা দেড় মিটারের বেশি। সীমান্তকেন্দ্রে পৌঁছনোর রাস্তাগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত। বৃষ্টি চলতে থাকায় নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে একশোর বেশি মানুষকে উদ্ধার করেছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনায় আটকে পড়া মানুষজনকেও সরানো হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এই বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল ২৬ অগস্ট। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং লিরুংয়ের কাছে প্রায় ৫,১২৭ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে। বরফ ও পাথরের বিপুল ধস লেন্দে খোলা নদী-উপত্যকায় নেমে এসে দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষবাহী স্রোত সৃষ্টি করে। উপগ্রহচিত্রের তুলনাতেও হিমবাহ ভেঙে পড়ার চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণায়ন বরফ ও পাহাড়ের স্থিতিশীলতা দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবারের হিসাবে, নেপালে ৩৮৯ এবং তিব্বতে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। দুই দিকে মোট নিখোঁজ ১,৪৬৮ জন। এর মধ্যেই সীমান্তের কাছে নতুন জলাধার তৈরি হওয়ায় আরও বন্যার সতর্কতা জারি হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম স্রোত সরে গেলেও বিপদ কাটেনি। গিরংয়ের আগে–পরের ছবি তাই শুধু ধ্বংসের পরিমাণ বোঝাচ্ছে না; উদ্ধারকারীদের সামনে পড়ে থাকা কঠিন পরিস্থিতিও তুলে ধরছে। কাদার নিচে চাপা রাস্তা, ভাঙা যোগাযোগব্যবস্থা এবং নতুন ধসের আশঙ্কার মধ্যেই চলছে মানুষের খোঁজ।