খবর

‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: বসনিয়ার যুদ্ধে গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগরত কুখ্যাত সার্ব সেনানায়ক রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু হয়েছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে।
  • কারাবন্দি অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
  • বসনিয়ার যুদ্ধের সময় জাতিগত নির্মূল অভিযানের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন ম্লাদিচ।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: বসনিয়ার যুদ্ধে গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগরত কুখ্যাত সার্ব সেনানায়ক রাতকো ম্লাদিচের মৃত্যু হয়েছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে। কারাবন্দি অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

বসনিয়ার যুদ্ধের সময় জাতিগত নির্মূল অভিযানের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন ম্লাদিচ। ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ ঘোষিত ‘নিরাপদ এলাকা’ স্রেব্রেনিৎসায় অন্তত আট হাজার মুসলিমকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য গণহত্যার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা।

‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত ম্লাদিচ একাধিকবার মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালনজনিত আঘাতের পরে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন।

রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থা তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দ্য হেগের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালগুলির অবশিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘‘দ্য হেগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ম্লাদিচের মৃত্যু হয়েছে।’’ তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে বিচারপতি গ্রাসিয়েলা গাত্তি সান্তানা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।

দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের তৎকালীন মানবাধিকার প্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেইন ম্লাদিচকে ‘অশুভের মূর্ত প্রতীক’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। বসনিয়ার যে যুদ্ধে এক লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং দশ লক্ষের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছিলেন, ম্লাদিচ ছিলেন সেই যুদ্ধের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখগুলির অন্যতম।

বসনীয় মুসলিমদের ‘মগজ ঝলসে দেওয়ার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। নিজেকে ‘সার্বদের ঈশ্বর’ বলেও দম্ভ করতেন।

সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রথম ম্লাদিচের মৃত্যুর খবর জানানো হয়। তার আগে তাঁর ছেলে দার্কো বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়েছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে বসনিয়ার যুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি ট্রাইব্যুনাল ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ষোলো বছর আত্মগোপনে থাকার পরে ২০১১ সালে সার্বিয়ায় গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি।

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নৃশংস যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল স্রেব্রেনিৎসার হত্যালীলা। ওই যুদ্ধের সময় বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোর অবরোধ পরিচালনা করেছিলেন ম্লাদিচ। প্রতিদিন কামান ও ট্যাঙ্কের গোলা এবং দূর থেকে নিশানা করা বন্দুকধারীদের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হত শহরটি। সেখানে দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সার্ব নেতৃত্বের লক্ষ্য ছিল বসনীয় মুসলিম, ক্রোয়াট এবং অন্য অ-সার্ব জনগোষ্ঠীকে জোর করে বিতাড়িত করা। বসনিয়ার ভূখণ্ড থেকে তাঁদের সরিয়ে বৃহত্তর সার্বিয়া গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ম্লাদিচকে।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ ছিল, সার্বিয়ার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচ এবং বসনীয় সার্বদের রাজনৈতিক নেতা রাদোভান কারাদজিচের সঙ্গে ম্লাদিচও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন।

২০১৪ সালে নিজের মামলার এক শুনানিতে ম্লাদিচ বলেছিলেন, ‘‘আমি এই আদালতকে মানি না।’’ সাজা ঘোষণার সময় চিৎকার করে উঠেছিলেন, ‘‘সব মিথ্যা, আপনারা সবাই মিথ্যাবাদী!’’

সার্ব বাহিনীর অভিযানের ভয়াবহতম পরিণতি দেখা যায় স্রেব্রেনিৎসায়। রাষ্ট্রপুঞ্জের ডাচ শান্তিরক্ষীদের সরে যাওয়ার পরে হাজার হাজার বসনীয় পুরুষ ও কিশোরকে জড়ো করে হত্যা করা হয়। বুলডোজারের সাহায্যে তাঁদের দেহ গণকবরে চাপা দেওয়া হয়।

স্রেব্রেনিৎসা দখলের দৃশ্য ধারণ করিয়েছিলেন ম্লাদিচ। সেই দৃশ্যে তাঁকে নিজের সেনাদের প্রশংসা করতে এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষীদের ধমক দিতে দেখা যায়। তাঁর হাতে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ থাকবেন—ম্লাদিচের এই দৃঢ় আশ্বাস ভুল করে বিশ্বাস করেছিলেন শান্তিরক্ষীরা।

ক্যামেরার সামনে ম্লাদিচ বলেছিলেন, ‘‘এই শহর আমরা সার্ব জনগণকে উপহার দিচ্ছি।’’ একসময় এলাকাটি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি এই জয়কে মুসলিম তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ বলে দাবি করেছিলেন।

পরের দিন ম্লাদিচের বাহিনীকে শিশুদের মিষ্টি বিলি করতে দেখা যায়। তাঁদের নিরাপদে চলে যেতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছিল। অথচ একই সময়ে হাজার হাজার পুরুষ ও কিশোরকে হত্যার প্রস্তুতি চলছিল।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles