খবর

ইরান যুদ্ধের খরচে টান মার্কিন নৌবাহিনীর কোষাগারে, বেতনের বরাদ্দ সরিয়েও চলছে লড়াই

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তীব্র আর্থিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
  • যুদ্ধের খরচ মেটাতে কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য খাত থেকে টাকা সরাতে বাধ্য হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী।
  • দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা নথি এবং নৌবাহিনীর আধিকারিক, ঠিকাদার ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথোপকথনে এই ছবি উঠে এসেছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তীব্র আর্থিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের খরচ মেটাতে কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য খাত থেকে টাকা সরাতে বাধ্য হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী। দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা নথি এবং নৌবাহিনীর আধিকারিক, ঠিকাদার ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথোপকথনে এই ছবি উঠে এসেছে।

আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমেছে। পাল্টা ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলিও বিধ্বস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার বাজেটের উপর চাপ বাড়ছে।

নৌবাহিনীর অর্থবরাদ্দ নিয়ে পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপি দেখেছে গার্ডিয়ান। তাতে সতর্ক করা হয়েছে, যুদ্ধ পরিচালনার খরচ মেটাতে বেতনের তহবিলে ‘হাত দেওয়ার’ ফলে সেই খাতে ‘ঘাটতি’ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ এবং প্রাক্তন আধিকারিকদের বক্তব্য, তহবিল ফুরিয়ে আসছে। অবসরপ্রাপ্ত নৌ-আধিকারিক হারলান উলম্যানের কথায়, “সঞ্চয়ের ভাঁড়টাই ভেঙে গিয়েছে।” উলম্যান নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ-সংক্রান্ত জাতীয় কমিশনের সদস্য। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, কমিশনের হয়ে এই মন্তব্য করছেন না।

এক জন আধিকারিক এবং নৌবাহিনীর এক ঠিকাদার জানিয়েছেন, নগদের টানাটানির কারণে স্থলভিত্তিক পরিকাঠামোর জরুরি নয় এমন রক্ষণাবেক্ষণ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করার পর দ্রুত সামরিক বাহিনীর চলতি বাজেটে চাপ পড়ে। বিশেষ করে নৌবাহিনীর উপর। প্রাথমিক আক্রমণে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পরে বিস্তৃত নৌ-অবরোধ কার্যকর করার দায়িত্বও দেওয়া হয় তাদের। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ মেটাতে কংগ্রেসের কাছে জরুরি অর্থবরাদ্দ চায় হোয়াইট হাউস। কিন্তু যুদ্ধের অজনপ্রিয়তার কারণে সেই অনুরোধ অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ঘাটতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত নৌবাহিনীর এক আধিকারিক জানিয়েছেন, নানা অভিনব উপায়ে এক খাতের টাকা অন্য খাতে সরানো হচ্ছে। তাঁর কথায়, “বিদেশে জরুরি সামরিক অভিযানের খরচ মেটাতে বেতনের টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন অন্য খাতে খরচ না-হওয়া টাকা এনে সেই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। আমাদের বেতনের পুরো টাকা যাতে পাওয়া যায়, সে জন্য বেতনের তহবিল আবার ভরা হচ্ছে।”

২০২৬ সালে নৌবাহিনীর বাজেট প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার। এর মধ্যে কর্মীদের ব্যয়, জাহাজ নির্মাণ, নির্দিষ্ট অস্ত্রব্যবস্থা কেনা এবং ‘পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’—অর্থাৎ নৌবহর ও ঘাঁটিগুলির দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য আলাদা আলাদা বরাদ্দ রয়েছে। এই অর্থ বরাদ্দ করে কংগ্রেস। এক খাত থেকে অন্য খাতে কতটা টাকা সরানো যাবে, আইন তার সীমা বেঁধে দিয়েছে।

কংগ্রেসের কয়েকটি শুনানিতে মাঝেমধ্যে এই সমস্যার উল্লেখ হয়েছে। ২১ জুলাই সেনেটের বরাদ্দ-সংক্রান্ত কমিটির শুনানিতে সুসান কলিন্স বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে, সামরিক বাহিনীর কয়েকটি শাখা অদূর ভবিষ্যতে আর্থিক দায় মেটানোর সমস্যায় পড়তে পারে।” তাঁর দপ্তরের এক কর্মী জানিয়েছেন, কলিন্স যে শাখাগুলির কথা বলছিলেন, নৌবাহিনী তার অন্যতম।

তবে এক বিবৃতিতে নৌবাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার তহবিল ফুরিয়ে যায়নি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বর্তমান বেতন সময়মতো মেটাতে নৌবাহিনী দপ্তর সক্রিয়ভাবে তার সম্পদের ব্যবস্থাপনা করছে। চলমান অভিযানের চাহিদা মেটাতে এবং গোটা অর্থবর্ষে আমাদের কর্মীদের প্রয়োজন ও সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখতে আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”

বাহিনীর ভিতরে অবশ্য অর্থসংকটের বিষয়টি গোপন নয়। রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক টড হ্যারিসন বলেন, “ওঁরা শুধু প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলছেন না।”

তাঁর আরও বক্তব্য, “আমার সন্দেহ, প্রতিরক্ষাসচিব থেকে শুরু করে পেন্টাগনের অসামরিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক কারণে সচেতনভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যে যুদ্ধ ক্রমশ রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে, তার জন্য ভবিষ্যতের সামরিক প্রস্তুতির ক্ষতি হচ্ছে—এমন ছবি তাঁরা সামনে আসতে দিতে চান না।”

‘গুরুতর ঘাটতির মুখে আমরা’

এই সংকট যে আসছে, সামরিক নেতৃত্ব তা জানত। মে মাসের মাঝামাঝি নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল কংগ্রেসকে সতর্ক করেছিলেন, জুলাইয়ে অর্থের টান প্রকট হবে।

তিনি বলেছিলেন, “২০২৬ অর্থবর্ষের বাজেট তৈরির সময় ‘এপিক ফিউরি’ অভিযানের খরচ ধরা হয়নি। আমার আশঙ্কা, জুলাই নাগাদ বাহিনীকে প্রস্তুত রাখার বিষয়ে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করতে হবে। ‘এপিক ফিউরি’র যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করতে মহড়া ও নিয়মিত অভিযানের ধরন বদলাতে হতে পারে।”

প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথও জরুরি অর্থবরাদ্দের জন্য কংগ্রেসের উপর চাপ দিয়েছেন। জুলাইয়ে তিনি বলেন, সেই অর্থ না পেলে “আমরা গুরুতর ঘাটতির মুখে পড়ব।” কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি জানান, ইরান যুদ্ধে ৩ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। তবে এই হিসাবে যুদ্ধের সমস্ত ব্যয় ধরা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিরক্ষা দপ্তরের জন্য ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার জরুরি বরাদ্দ চেয়েছিল। তার কতটা নৌবাহিনীর জন্য, তা আলাদা করে জানানো হয়নি। জুলাইয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ১ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি ডলারের একটি প্রতিরক্ষা বিল পাশ করে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের জন্য ৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলার দেওয়ার পৃথক বাজেট-অনুমোদনও পাশ হয়। কিন্তু কোনওটিই শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি নয়।

উলম্যানের বক্তব্য, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের সময় কংগ্রেস থেকে অর্থ পাওয়া তুলনায় সহজ ছিল। কারণ, প্রস্তাব পাশ করে ওই সংঘাতগুলির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কোনও অনুমোদন নেই। যে সংঘাতের অনুমোদন কংগ্রেস দেয়নি, তার খরচ মেটাতে কি কংগ্রেস বাধ্য?”

‘ওদের টাকা ফুরিয়ে গিয়েছে’

নৌবাহিনীর কোষাগার ফাঁকা—অন্তত এই মুহূর্তে খরচ করার টাকা ফুরিয়েছে—এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

ট্রাম্প প্রায়ই প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্টের সঙ্গে নিজের সাযুজ্যের কথা বলেন। ১৯০১ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন রুজভেল্ট মার্কিন নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ ঘটান। তাঁর পাঠানো ‘গ্রেট হোয়াইট ফ্লিট’ বা ‘মহান শ্বেত নৌবহর’ বিশ্ব পরিক্রমা করেছিল।

ট্রাম্প প্রশাসন সেই নামের বদলে বেছে নিয়েছে ‘গোল্ডেন ফ্লিট’ বা ‘স্বর্ণ নৌবহর’। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষী নৌ-পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিশালাকার ‘ট্রাম্প শ্রেণি’র যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ—যা হবে মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম রণতরী।

নৌবাহিনীর খুঁটিনাটি বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। একটি বিমানবাহী রণতরীর নকশা বদলে তড়িৎচুম্বকীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে বাষ্প ও জলবাহী চাপচালিত ব্যবস্থায় যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণের নির্দেশও তার মধ্যে রয়েছে। গার্ডিয়ানের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছরই বিমানবাহী রণতরীর বিমান উৎক্ষেপণব্যবস্থা নিয়ে নিজের পছন্দের কথা জানিয়েছেন তিনি।

কিন্তু এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হল এমন একটি যুদ্ধের খরচ জোগানো, যার শেষ লক্ষ্য স্পষ্ট নয়।

বর্তমানে নৌবাহিনীর একটি ঠিকাদার সংস্থায় কর্মরত এক প্রাক্তন সামরিক আধিকারিক এই ঘাটতির বিষয়ে অবহিত। তাঁর তীব্র মন্তব্য, “ওদের অবস্থা একেবারে সর্বনাশা। সব অস্ত্র ছুড়ে শেষ করেছে, সব জাহাজের দফারফা করেছে, আর টাকাও ফুরিয়ে গিয়েছে।”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles