বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি। কিন্তু সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা এ বার অনেক আগেই শুরু করতে চাইছে কংগ্রেস। দলের নেতাদের মতে, শেষ মুহূর্তের দরকষাকষির বদলে আগে থেকেই ‘জেতার মতো’ বা ‘গুণগত ভাবে ভাল’ আসন চিহ্নিত করা গেলে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের উপস্থিতি বাড়ানো সম্ভব হবে। ২০১৭ সালের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সফল সমঝোতার মডেলকেই সামনে রাখছে দল।
সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেস— দুই দলই উত্তরপ্রদেশের ৪০৩টি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে পৃথক সমীক্ষা চালাচ্ছে। কোন কেন্দ্রে দলের সাংগঠনিক শক্তি কতটা, অতীতের নির্বাচনী ফল কী, জাতিগত সমীকরণ কেমন, সম্ভাব্য প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং জোটসঙ্গীর ভোট কতটা স্থানান্তরিত হতে পারে— এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি সংসদের অধিবেশনের ফাঁকে উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস সাংসদদের সঙ্গে বৈঠক করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা। সূত্রের দাবি, তার আগে দিল্লিতে রাহুল ও প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব।
কংগ্রেসের ওই বৈঠকে উত্তরপ্রদেশে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে সাংসদদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। নেতাদের বড় অংশের বক্তব্য, আসন সমঝোতার আলোচনা যত দ্রুত সম্ভব শুরু হওয়া উচিত। শুধু কতগুলি আসন কে পাবে, সেই সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং কোন কেন্দ্রে কোন দলের প্রার্থী জোটকে জেতাতে পারবেন, সেটিই আসন বণ্টনের প্রধান মাপকাঠি হওয়া দরকার।
এক কংগ্রেস নেতার কথায়, মুখ্যমন্ত্রীর পদ নিয়ে তাঁদের কোনও দাবি নেই; সেটি সমাজবাদী পার্টির বিষয়। কংগ্রেসের লক্ষ্য উত্তরপ্রদেশে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করা। সে কারণেই বেশি সংখ্যক আসনের পরিবর্তে এমন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রয়োজন, যেখানে জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
বেশি আসন নয়, কংগ্রেসের লক্ষ্য ‘ভাল আসন’
এই কৌশলের পিছনে রয়েছে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের দুর্বল বিধানসভা উপস্থিতি। দল মনে করছে, শুধুমাত্র অতীতে কোনও আসনে বারবার কংগ্রেস প্রার্থী দিয়েছে বলেই ভবিষ্যতেও সেই কেন্দ্র কংগ্রেসের ভাগে পড়তে হবে— এমন ধারণা জোটের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে।
এক কংগ্রেস সাংসদের বক্তব্য, কোনও দল যদি একটি কেন্দ্রে পরপর তিন বার হেরে থাকে, তা হলে শুধু পুরনো দাবি বজায় রাখার জন্য সেই আসন তাকে দিয়ে লাভ নেই। বরং অন্য শরিকের প্রার্থী যদি নিজের দলের ভোটের সঙ্গে জোটসঙ্গীর ভোটও একত্রিত করতে পারেন, তা হলে সেই প্রার্থীকেই এগিয়ে দেওয়া উচিত।
কংগ্রেস তাই আপাতত ৪০৩টি আসনেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে চায়। পরে সমীক্ষার ভিত্তিতে এমন কেন্দ্রগুলি চিহ্নিত করা হবে, যেখানে কংগ্রেসের নিজস্ব সংগঠন, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, জাতিগত সমীকরণ এবং সমাজবাদী পার্টির ভোট একত্রিত হলে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
২০১৭-র ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
আগেভাগে সমঝোতার উপর কংগ্রেসের জোর দেওয়ার অন্যতম কারণ ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। সে বার সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোট বেঁধে লড়েছিল। সমাজবাদী পার্টি ৩১১টি এবং কংগ্রেস ১১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। কিছু আসনে দুই দলের মধ্যে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ও হয়েছিল।
ফল ছিল বিপর্যয়কর। জোট মাত্র ৫৪টি আসন জিতেছিল— সমাজবাদী পার্টি ৪৭টি এবং কংগ্রেস সাতটি। অন্য দিকে ৪০৩ আসনের বিধানসভায় বিজেপি একাই ৩১২টি আসন দখল করেছিল।
কংগ্রেসের মূল্যায়ন, শেষ মুহূর্তে জোট হওয়ায় বুথ এবং বিধানসভা কেন্দ্র স্তরে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় তৈরি হয়নি। কাগজে জোট হলেও বহু জায়গায় তা মাটিতে কার্যকর হয়নি। উপরন্তু, ২০টিরও বেশি আসনে দুই জোটসঙ্গীর ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছিল।
সামনে ২০২৪-এর সফল মডেল
২০১৭-র সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা যায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। উত্তরপ্রদেশের ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে সমাজবাদী পার্টি ৬২টি এবং কংগ্রেস ১৭টি আসনে লড়েছিল। সমাজবাদী পার্টি ৩৭টি এবং কংগ্রেস ছ’টি আসনে জয়ী হয়। দুই দলের সম্মিলিত আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ৪৩।
অন্য দিকে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে ৬২টি আসন জেতা বিজেপি ২০২৪ সালে নেমে আসে ৩৩টিতে।
কংগ্রেসের কাছে এই ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা। বেশি আসনে প্রার্থী দেওয়ার চেয়ে জোটের মধ্যে থেকে তুলনামূলক কম কিন্তু জেতার সম্ভাবনা বেশি এমন আসনে লড়াই করলে দলের ফল অনেক ভাল হতে পারে।
২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সেই সূত্র প্রয়োগ করতে চাইছে কংগ্রেস। প্রয়োজনে প্রত্যাশার তুলনায় কম আসনেও দল রাজি হতে পারে, যদি সেই আসনগুলিতে জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকে।
সতর্ক সমাজবাদী পার্টি
তবে সমাজবাদী পার্টি এখনও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। দলের এক প্রবীণ নেতার বক্তব্য, কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে তাঁরা মন্তব্য করতে চান না। জোট সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বই নেবেন।
একই সঙ্গে সমাজবাদী পার্টি মনে করিয়ে দিচ্ছে, ২০২৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের তুলনায় তাদের রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত।
দুই দল পৃথক সমীক্ষা চালানোর ফলে শেষ পর্যন্ত একটি অভিন্ন ভিত্তিতে পৌঁছনো সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন কংগ্রেস নেতারা। তবে বাস্তবে এই সূত্র কার্যকর করা সহজ হবে না। কারণ বহু বিধানসভা কেন্দ্রে স্থানীয় নেতারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জোটের স্বার্থে তাঁদের কাউকে আসন ছাড়তে হলে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তা সত্ত্বেও কংগ্রেসের কৌশল স্পষ্ট— উত্তরপ্রদেশে এখন লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব আসনে লড়া নয়, বরং যত বেশি সম্ভব আসনে জেতা। আর সেই কারণেই ২০১৭-র ভুল এড়িয়ে ২০২৪-এর সাফল্যের সূত্র ধরে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে অনেক আগে থেকেই আসন সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইছে দল।