Home খবর ৭৫ কোটির ‘নিলাম’!

৭৫ কোটির ‘নিলাম’!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
12 views 10 minutes read
A+A-
Reset

নয় দিল্লির সাধারণ বাড়ি, নয় কোনও অখ্যাত জমি। লক্ষ্য ছিল লুটিয়েন্স দিল্লির বাংলো, ডিএলএফের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, এমনকি গুরুগ্রামের গোটা একটি শপিং মল। অভিযোগ, জাল নথি, ভুয়ো ব্যাঙ্ক-নিলাম আর অস্বাভাবিক কম দামের টোপ দেখিয়ে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদেরও ফাঁদে ফেলেছিল একটি চক্র। কেন্দ্রীয় চরিত্র মোহিত গোগিয়া। আর তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কথিত সম্পত্তি প্রতারণার চাঞ্চল্যকর ছবি।

দিল্লির অমৃতা শেরগিল মার্গের ৯ নম্বর বাংলোটি নাকি পাওয়া যাবে মাত্র ৭৫ কোটি টাকায়। তাও আবার স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার ‘নিলাম’ থেকে। এমন প্রস্তাবই পেয়েছিলেন আবাসন ব্যবসায়ী সোনাক্ষী বনশল।

প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন মোহিত গোগিয়া। তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে। সঙ্গে ছিল বিলাসবহুল জীবনযাপন, দামি গাড়ি, ব্যবসা এবং সামাজিক যোগাযোগের ঝকঝকে পরিচয়। পুলিশের অভিযোগ, এই বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সোনাক্ষী ইউনিটি গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ডিরেক্টর কৃষ্ণকুমার আগরওয়ালের মেয়ে। ফলে তিনি কোনও আনকোরা ক্রেতা নন। তবু গোগিয়ার কথিত ফাঁদে পড়ে তাঁদের পরিবার কোটি কোটি টাকা হারিয়েছে বলে অভিযোগ।

দিল্লি পুলিশের আর্থিক অপরাধ দমন শাখা বা ইওডব্লিউয়ের তদন্তে ইতিমধ্যেই গোগিয়া, তাঁর স্ত্রী শ্বেতা এবং ব্যবসায়ী অভিনব পাঠক-সহ ছ’জন গ্রেফতার হয়েছেন। তদন্তকারীদের দাবি, গোটা দেশে গোগিয়ার বিরুদ্ধে অন্তত ১২টি মামলার সন্ধান মিলেছে।

বিশ্বাসটা তৈরি হয়েছিল ধীরে ধীরে

গল্পের শুরু ২০২৪ সালের অগস্টে।

মধ্য দিল্লির রাজেন্দ্র নগরে ‘ব্ল্যাক টিক রিয়েলটি’-র অফিসে সোনাক্ষী বনশলের সঙ্গে দেখা করতে যান গোগিয়া। সঙ্গে ছিলেন অভিনব পাঠক। প্রথম দেখাতেই কোটি টাকার সম্পত্তির কথা নয়—আলোচনা শুরু হয় একটি পেন্টহাউস কেনার সম্ভাবনা নিয়ে।

গোগিয়া জানান, স্ত্রী শ্বেতার সঙ্গে তিনি ‘এমজি লিজিং অ্যান্ড ফিনান্স’ নামে ব্যবসা চালান। পাশাপাশি গুরুগ্রামের ৬৩ নম্বর সেক্টরে তাঁর জমি রয়েছে এবং সেখানে যৌথ ভাবে আবাসন প্রকল্প করার জন্য অংশীদার খুঁজছেন বলেও জানান।

এরপর শুরু হয় নিয়মিত যাতায়াত। মাসের পর মাস আলোচনা। অর্থাৎ, অমৃতা শেরগিল মার্গের বাংলোর প্রস্তাব যখন আসে, তখন গোগিয়া আর পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ নন।

বরং তাঁকে যাচাই করেও বিশেষ সন্দেহের কারণ মেলেনি বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।

তাঁরা দেখেছিলেন পটেল নগরের অভিজাত এলাকায় তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি। ছিল ল্যাম্বরগিনি। দিল্লিতে ‘ওবেলো’ নামে বিলাসবহুল সালোঁর ব্যবসাও ছিল। ২০২৫ সালের জুনে একটি প্রথম সারির প্রকাশনায় তাঁকে বিলাসবহুল পণ্য ও নিলামের বাজারের উঠতি উদ্যোগপতি হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছিল।

অর্থাৎ, বিশ্বাসযোগ্যতার মঞ্চটা তৈরি ছিল।

তার পর এল আসল প্রস্তাব।

লুটিয়েন্সের বাংলো, ৭৫ কোটিতে

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গোগিয়া জানতে পারেন, আগরওয়াল পরিবার বসন্ত বিহারে একটি বাড়ি কেনার কথা ভাবছে। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তার চেয়েও বড় প্রস্তাব দেন—লুটিয়েন্স দিল্লির ৯ নম্বর অমৃতা শেরগিল মার্গ।

দাবি, স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া সম্পত্তিটি বাজেয়াপ্ত করেছে এবং ব্যাঙ্কের নিলাম থেকে প্রায় ৭৫ কোটি টাকায় সেটি পাওয়া যাবে।

সোনাক্ষী, তাঁর স্বামী, বাবা ও ভাই গিয়ে সম্পত্তি দেখেও আসেন। সেখানে পাশাপাশি ৯ এবং ৯এ নম্বরের দু’টি বাংলো।

গোগিয়ার দাবি ছিল, দু’টি সম্পত্তিই একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

আর দাম?

মাত্র ৭৫ কোটি টাকা।

অমৃতা শেরগিল মার্গের একটি বাংলোর বাজারদরই যেখানে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, সেখানে দু’টি সম্পত্তি মিলিয়ে ৭৫ কোটি। পুলিশের অভিযোগ, এই অস্বাভাবিক কম দামই ছিল সবচেয়ে বড় টোপ।

গোগিয়ার ব্যাখ্যাও ছিল তৈরি—ব্যাঙ্কের নিলামে তাঁর ‘বিশেষ যোগাযোগ’ রয়েছে। তাই সাধারণ ক্রেতাদের আগেই তিনি সম্পত্তি পাইয়ে দিতে পারবেন।

এমনকি সম্পত্তির নিরাপত্তারক্ষীও নাকি সোনাক্ষীকে জানিয়েছিলেন, বাড়িটি স্টেট ব্যাঙ্কের অধীনে রয়েছে।

কিন্তু তদন্তে উঠে আসে অন্য ছবি।

পুলিশের দাবি, স্টেট ব্যাঙ্ক কখনও ওই সম্পত্তি নিলামে তোলেনি। ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষের ঋণের জামানত হিসেবে সম্পত্তিটি বন্ধক রাখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

অর্থাৎ সত্যিটা ছিল—সম্পত্তির সঙ্গে ব্যাঙ্কের সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ, সেই সত্যের উপর দাঁড়িয়েই বানানো হয়েছিল বড় মিথ্যেটা—‘ব্যাঙ্ক নিলাম’।

৪৩ কোটি গেল, বাংলো এল না

২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যেই সোনাক্ষী মোট ৭৫ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা গোগিয়াকে দিয়ে দেন বলে অভিযোগ।

বাকি টাকার ব্যবস্থাও নাকি হয়ে যাবে। গোগিয়া জানান, স্টেট ব্যাঙ্ক থেকেই ঋণ পাওয়া যাবে।

এদিকে একই পরিবারের সঙ্গে আর একটি বড় লেনদেন এগোচ্ছিল। সোনাক্ষীর তুতো ভাই ও ব্যবসায়িক অংশীদার মৃণাল মিত্তলকে গুরুগ্রামের ৬৩ নম্বর সেক্টরের জমি ৬০ কোটি টাকায় বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন গোগিয়া বলে পুলিশের অভিযোগ।

অর্থাৎ এই দুই লেনদেনের অঙ্কই প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা।

তার পর থেকেই শুরু হয় অজুহাতের পালা।

প্রথমে বলা হয়, আয়কর দফতরের হানার কারণে লেনদেন আটকে রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে দখল দেওয়া হবে—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়।

মার্চ চলে গেল।

বাংলো এল না।

এর পর নতুন কারণ—সম্পত্তির উপর ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার আরও একটি বন্ধক রয়েছে। সেটি মেটানো না হলে সম্পত্তি ছাড়ানো সম্ভব নয়।

এত টাকা দেওয়ার পর বনশাল পরিবার আরও একটি চেক দেয় বলে অভিযোগ।

এরপর গোগিয়া কিছু কাগজপত্র এবং বাড়ির চাবি দেন। দাবি করেন, এগুলিই সম্পত্তির নথি।

কিন্তু চাবি হাতে থাকলেও বাড়ির বৈধ দখল মিলল না।

বাংলো রইল অন্যের দখলে। টাকা গেল গোগিয়ার কাছে।

শেষ আশ্বাসও বাউন্স

২০২৫ সালের মে মাসে বনশাল পরিবার ফের গোগিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এবার তিনি কয়েকটি ভবিষ্যৎ তারিখের চেক দেন। বলেন, মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। তার মধ্যে দখল না পেলে চেকগুলি জমা দিয়ে টাকা ফেরত নেওয়া যাবে।

কিন্তু সেই চেকও বাউন্স করে বলে অভিযোগ।

এবার সন্দেহ আর সন্দেহ রইল না।

২০২৫ সালের জুনে দিল্লি পুলিশের দ্বারস্থ হয় বনশাল পরিবার। পরে তদন্তভার যায় ইওডব্লিউয়ের হাতে।

আর সেখান থেকেই খুলতে শুরু করে আরও বড় একটি জাল।

৩১ কোটিতে ম্যাগনোলিয়াস!

গুরুগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ী ব্রহ্ম সিং তনওয়ারের অভিযোগেও উঠে আসে একই কৌশলের ছাপ।

২০২৪ সালের মে মাসে গোগিয়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। প্রথমে ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ির লেনদেন। গোগিয়ার ঝকঝকে জীবনযাপন তনওয়ারের নজর কাড়ে।

তারপর আসে সম্পত্তির প্রস্তাব।

গুরুগ্রামের একটি জমি এবং ডিএলএফ ম্যাগনোলিয়াসের একটি ফ্ল্যাট—সব মিলিয়ে মাত্র ৩১ কোটি টাকা।

সমস্যা একটাই—ম্যাগনোলিয়াসের একটি ফ্ল্যাটের দামই প্রায় ৪২ কোটি থেকে ৮৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তবু নথিপত্র দেখে সন্দেহ কাটানো সম্ভব হয়েছিল বলে তনওয়ারের দাবি। ছিল ব্যাঙ্কের চিঠির মতো কাগজ, তথাকথিত অনুমোদন, এমনকি বারকোডও। সেটি স্ক্যান করলে আপাতদৃষ্টিতে ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি পেজ খুলত বলে অভিযোগ।

অর্থাৎ শুধু কথায় নয়, নথি আর প্রযুক্তির ছদ্মবেশেও তৈরি হয়েছিল বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণ।

ক্যামেলিয়াসে ১২.৫ কোটি

আর এক অভিযোগকারিণীকে ডিএলএফ ক্যামেলিয়াসে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের অভিযোগ।

এই মামলাতেই গত বছরের ২২ নভেম্বর গোগিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্তের পরিধি আরও বাড়তেই সামনে আসে আরও অবিশ্বাস্য একটি তথ্য।

গোগিয়া নাকি এক সময় প্রায় ১৮০ কোটি টাকায় গুরুগ্রামের গোটা অ্যাম্বিয়েন্স মল বিক্রি করে দেওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।

একটি বাংলো নয়।

একটি ফ্ল্যাট নয়।

এ বার গোটা একটি শপিং মল।

পুলিশের দাবি, এই ঘটনাতেও অভিনব পাঠকের নাম উঠে আসে। পাঠকের বক্তব্য, গোগিয়া প্রথমে তাঁকেই মলটি বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, গোগিয়া তাঁকে বলেছিলেন, তিনি নিজেই ৫০০ কোটি টাকায় মলটি কিনছেন এবং পাঠক চাইলে অংশীদার হতে পারেন।

তদন্তকারীদের কাছে প্রশ্ন তখন আরও বড়—একজন ব্যক্তি কী ভাবে বারবার শতকোটি টাকার সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিশ্বাস করাতে পারছিলেন?

বিলাসবহুল জীবনই ছিল ‘ভেরিফিকেশন’

গোগিয়ার জীবনের গল্পটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১৯৮৭ সালে দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরে জন্ম। কলেজে ভর্তি হলেও দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে চাকরি এবং ব্যবসা।

২০১২ সালে নিজের আর্থিক পরিষেবা সংস্থা। পরে ব্যবহৃত গাড়ির ব্যবসা। ২০১৬ সালে ‘এমজি ফিনান্স অ্যান্ড লিজিং’।

নিজের বক্তব্য অনুযায়ী দিল্লি, মুম্বই ও ভোপালে রেস্তোরাঁ এবং ক্লাবের ব্যবসার সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।

রাজেন্দ্র নগরের ৬বি নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলা জুড়ে ছিল তাঁর বিলাসবহুল বাসস্থান। বাইরে ধ্রুপদি নকশা, লম্বা বারান্দা, কারুকার্যময় রেলিং।

আর গাড়ি?

নিরাপত্তারক্ষীর স্মৃতিতে ল্যাম্বরগিনি, মার্সিডিজ মেবাখ, রেঞ্জ রোভার, বিএমডব্লিউ ৭ সিরিজ—একাধিক দামি গাড়ির আনাগোনা।

সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে এগুলিই হয়তো হয়ে উঠেছিল তাঁর আর্থিক সামর্থ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ।

আসল ‘বস’ কে?

তদন্ত যত এগোয়, পুলিশের সন্দেহ ততই গোগিয়ার বাইরেও ছড়ায়।

সামনে আসে পশ্চিম দিল্লির ৪৯ বছর বয়সি অর্থলগ্নিকারী রাম সিংয়ের নাম।

২০০৫ সালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ নগরে ‘বাবা জি ফিনান্স’ নামে একটি বেসরকারি ঋণদাতা সংস্থা শুরু করেন তিনি। সংস্থাটি অসংগঠিত ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি সম্পত্তির দালালির কাজও করে।

রাম সিংয়ের নিজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সংস্থায় কর্মী মাত্র একজন।

কিন্তু পুলিশের দাবি, মামলায় ধৃত প্রায় সব অভিযুক্তই জিজ্ঞাসাবাদে রাম সিংকে তাঁদের ‘বস’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

তদন্তকারীদের সন্দেহ, গোগিয়ার পিছনে হয়তো আরও বড় কোনও নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং তার কেন্দ্রে থাকতে পারেন রাম সিং।

তবে রাম সিং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সম্পত্তির ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্যই তিনি গোগিয়াকে টাকা দিয়েছিলেন। এর বেশি কোনও ভূমিকা তাঁর ছিল না।

সমন পাঁচ মাস, পরোয়ানা জারি

গোগিয়াকে গ্রেফতারের পর রাম সিংকে তদন্তে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয় দিল্লি পুলিশ। কিন্তু পুলিশের দাবি, তিনি পর পর পাঁচ মাস সমন এড়িয়ে যান।

শেষ পর্যন্ত স্থানীয় আদালত তাঁর বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

তবু তাঁকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি।

এদিকে গোগিয়ার কথিত বিবৃতিতে রাম সিংয়ের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি উঠে এসেছে।

গোগিয়ার দাবি, ২০২২ সালে রাম সিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বেশি লাভের আশায় তিনি নিজের টাকাও ‘বাবা জি ফিনান্স’-এ রাখতে শুরু করেছিলেন।

২০২৩ সালের জুলাই-অগস্টে রাম সিংই নাকি বড় অঙ্কের টাকা বাজার থেকে তোলার পরিকল্পনা সামনে আনেন।

পদ্ধতিটিও ছিল নির্দিষ্ট।

ব্যাঙ্কে বন্ধক থাকা বা আইনি বিবাদে থাকা সম্পত্তি খুঁজে বার করা হবে। তারপর সেটিকে এমন ভাবে দেখানো হবে যেন ব্যাঙ্ক সম্পত্তিটি বাজেয়াপ্ত করেছে এবং বিশেষ যোগাযোগের মাধ্যমে বাজারদরের অনেক কমে তা কিনে নেওয়া সম্ভব।

গোগিয়ার কাজ ছিল সম্ভাব্য সম্পত্তি খুঁজে বের করা এবং ক্রেতা জোগাড় করা। জাল নথি তৈরির ব্যবস্থাও করা হত বলে অভিযোগ। অন্য সদস্যরা টাকা ঘোরানোর জন্য বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ব্যবস্থা করতেন।

গোগিয়ার কথিত বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতারিত অর্থের ৩০ শতাংশ তাঁর ভাগে যেত।

রাম সিং অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

নতুন টাকা দিয়ে পুরনো টাকা

তদন্তে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলির একটি হল কথিত ‘ঘূর্ণি’ ব্যবস্থা।

কোনও নতুন ক্রেতার কাছ থেকে টাকা এল। সেই টাকার একাংশ দিয়ে আগের ক্রেতাকে ফেরত দেওয়া হল। ফলে পুরনো অভিযোগ সাময়িক ভাবে থামানো গেল।

তারপর আবার নতুন সম্পত্তির প্রস্তাব।

নতুন ক্রেতা।

নতুন অগ্রিম।

নতুন টাকা দিয়ে পুরনো সমস্যা সামলানো।

পুলিশের দাবি, যত দিন নতুন টাকা আসছিল, তত দিন এই ব্যবস্থা চলছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে আয়কর দফতরের হানার পর গোগিয়ার আর্থিক অবস্থায় ধাক্কা লাগে।

তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বকেয়া মেটাতে হয়।

একই সময়ে পুরনো ক্রেতাদের টাকা ফেরতের চাপ বাড়ছিল। অভিযোগ এবং মামলা বাড়ছিল। অর্থাৎ নতুন টাকা আসার গতি কমছিল, কিন্তু পুরনো দায় বাড়ছিল।

সেখানেই ভেঙে পড়তে শুরু করে কথিত আর্থিক কাঠামো।

২০০ কোটি—নাকি আরও বেশি?

দিল্লি পুলিশ গোটা ঘটনাকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি প্রতারণা হিসেবে দেখছে। তবে তদন্তে সামনে আসা লেনদেনগুলির পরিধি আরও বড় বলে মনে হচ্ছে।

সোনাক্ষী বনশল ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত দু’টি লেনদেনের অঙ্কই প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা।

তার সঙ্গে রয়েছে ম্যাগনোলিয়াসের ৩১ কোটি টাকার প্রস্তাব, ক্যামেলিয়াসে ১২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, পঞ্জাবের জিরকপুরে ১৮১ একর জমি সংক্রান্ত মামলা এবং অ্যাম্বিয়েন্স মল নিয়ে প্রায় ১৮০ কোটি টাকার কথিত প্রস্তাব।

তবে সব প্রস্তাবের টাকা গোগিয়া বা তাঁর সহযোগীদের হাতে পৌঁছেছিল—এমন দাবি পুলিশ করেনি। ২০০ কোটির অঙ্কটি বর্তমানে তদন্তাধীন কথিত প্রতারণার পরিমাণ।

ফাঁদের আসল চাবিকাঠি ছিল বিশ্বাস

এই মামলার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক সম্ভবত এখানেই।

অভিযোগকারীদের অনেকেই অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। সম্পত্তির বাজার সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ছিল। আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার ক্ষমতাও ছিল।

তবু তাঁরা কেন ফাঁদে পড়লেন?

তদন্তে যে ছবি উঠে আসছে, তাতে গোগিয়ার কৌশল ছিল একাধিক স্তরে বিশ্বাস তৈরি করা।

প্রথমে বিলাসবহুল জীবনযাপন।

তারপর ব্যক্তিগত যোগাযোগ।

তারপর ধীরে ধীরে বড় লেনদেনের প্রস্তাব।

তার সঙ্গে ব্যাঙ্কের নাম।

জাল নথি।

বারকোড।

ডিজিটাল যাচাইয়ের ছদ্ম ব্যবস্থা।

আর সবশেষে বাজারদরের তুলনায় অবিশ্বাস্য কম দাম।

অমৃতা শেরগিল মার্গের ঘটনাই তার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ।

সম্পত্তিটি সত্যিই ঋণের জামানত হিসেবে বন্ধক ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু অভিযোগ, সেই সত্যকেই বদলে দেওয়া হয়েছিল ‘ব্যাঙ্ক নিলাম’-এর গল্পে।

একটি সত্য তথ্যের উপর দাঁড়ানো মিথ্যা যে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে, এই মামলাটি তারই ভয়াবহ উদাহরণ।

এখনও দাঁড়িয়ে সেই বাংলো

অমৃতা শেরগিল মার্গের ৯ নম্বর বাংলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

পাশের ৯এ-তেও মালিকের পরিবার বসবাস করছে। বাইরে নিরাপত্তারক্ষী। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির মালিকের মেয়ের বক্তব্য, সম্পত্তি বিক্রির কোনও পরিকল্পনাই তাঁদের ছিল না।

অর্থাৎ যে বাড়িকে ৭৫ কোটি টাকার ‘ব্যাঙ্ক নিলাম’-এর সম্পত্তি হিসেবে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেটি এখনও তার প্রকৃত মালিকদেরই দখলে।

আর রাজেন্দ্র নগরের যে বাড়ি এক সময় গোগিয়ার বিলাসবহুল জীবনের প্রতীক ছিল, সেখানে এখন তাঁর পরিচয়ই যেন ফিকে।

এক প্রতিবেশী নাম শুনে প্রশ্ন করেছিলেন—“কোন গোগিয়া?”

কয়েক মাস আগেও যে জীবনযাপন সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ ছিল, এখন সেই জীবনই তদন্তের অন্যতম সূত্র।

ছ’জন গ্রেফতার। একাধিক মামলা। কোটি কোটি টাকার লেনদেন। জাল নথির অভিযোগ। আর তদন্তকারীদের নজরে রাম সিংয়ের মতো আরও কয়েকটি নাম।

তবু অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি—টাকা কোথায় গেল? কোন কোন অ্যাকাউন্ট দিয়ে তা ঘুরেছে? জাল নথি কারা তৈরি করেছিল? আর রাম সিংয়ের প্রকৃত ভূমিকা কতটা?

লুটিয়েন্স দিল্লির বাংলো থেকে গুরুগ্রামের বিলাসবহুল আবাসন, সেখান থেকে একটি গোটা শপিং মল—অভিযোগ অনুযায়ী প্রতিবারই সামনে রাখা হয়েছিল একই স্বপ্ন:

যে সম্পত্তি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, সেটিই নাকি মিলবে বাজারদরের অনেক কমে।

লোভনীয় সেই ‘সুযোগ’-এর দাম অবশ্য ক্রেতাদের কারও কাছে কয়েক কোটি, কারও কাছে কয়েক দশ কোটি।

আর ৯ নম্বর অমৃতা শেরগিল মার্গের বাংলো?

সেটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে—৭৫ কোটি টাকার সেই কথিত ‘নিলাম’-এর নীরব সাক্ষী হয়ে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles