বাংলার দুর্গাপুজো বহুকাল আগেই কেবল দেবীর আরাধনায় আটকে নেই। কোথাও মণ্ডপে উঠে আসে মিশরের পিরামিড, কোথাও ভ্যাটিকান, কোথাও আবার চন্দ্রযান। রুবির মোড় এ বার আরও সাহসী। মহাকাশ, ইতিহাস বা পরিবেশ নয়—তাদের বিষয় বাংলার সদ্যোজাত রাজনৈতিক মহাকাব্য। নাম, ‘নন্দীগ্রাম থেকে নবান্ন: বুবাইয়ের জয়যাত্রা’। বুবাই অর্থাৎ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এমন আয়োজনের পরে দুর্গাপ্রতিমা কোথায় বসবে, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি স্থাপত্যগত প্রশ্ন।

অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার এই পুজোয় মণ্ডপজুড়ে তুলে ধরা হবে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবন। ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি, তৃণমূলে উত্থান, নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন, বিজেপিতে যোগদান, বিরোধী দলনেতার আসন হয়ে নবান্নে প্রবেশ—সবই থাকবে ছবি, মডেল, দেওয়ালচিত্র ও তথ্যচিত্রে। বাইরে বসবে মুখ্যমন্ত্রীর আবক্ষ মূর্তি। অর্থাৎ মণ্ডপে ঢোকার আগেই দর্শনার্থীদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে, এ যাত্রায় দেবী দর্শন করতে হলে প্রথমে কাকে প্রণামসদৃশ দৃষ্টি দিয়ে যেতে হবে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, শুভেন্দুর সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনি জনসমক্ষে তুলে ধরাই তাঁদের লক্ষ্য। কৃষ্ণনগরের শিল্পী তরুণ পাল মুখ্যমন্ত্রীর আবক্ষ মূর্তি তৈরি করছেন। মুসুর ডালের উপরও আঁকা হবে তাঁর ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি, যা আতশকাচ দিয়ে দেখতে হবে। রাজনীতিতে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি যথেষ্ট বৃহৎ; ফলে শিল্পীরা সম্ভবত ভারসাম্য রক্ষার জন্য তাঁকে ডালের উপর ক্ষুদ্র করে ধরছেন। তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মুসুর ডালের বদলে ভোটযন্ত্রের বোতামের উপর ছবি আঁকলে বিষয়টি কি আরও যথাযথ হত না?

চমক এখানেই শেষ নয়। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কালীঘাটের হিন্দু মহাসভা ঘাটের মাটি দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করা হবে। জায়গাটি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কাছাকাছি। রাজনৈতিক ব্যঙ্গের এমন সূক্ষ্ম প্রয়োগ বাংলার থিমপুজোয় সচরাচর দেখা যায় না। মাটিও কালীঘাটের, জয়গানও শুভেন্দুর—পরাজিত প্রতিপক্ষকে যেন ভূমিকা দেওয়া হয়েছে, তবে মাটির ভূমিকায়। গণতন্ত্রে ক্ষমতা বদলের পরে এর চেয়ে প্রতীকী পুনর্ব্যবহার আর কী হতে পারে!

পুজোর উদ্বোধনে শুভেন্দুকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে পেতে চান আয়োজকেরা। আমন্ত্রণ যাবে তাঁর বাবা-মায়ের কাছে, নবান্নে, লোকভবনে, রাষ্ট্রপতি ভবনে, প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এবং বিজেপির সদর দফতরে। একটি পাড়ার পুজোর অতিথি তালিকা দেখে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রের যাবতীয় সাংবিধানিক স্তম্ভ এ বার রুবির মোড়ে এসে একসঙ্গে অঞ্জলি দেবেন। শুধু রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারকে আমন্ত্রণ জানানো বাকি। আগামী বছর পুজোর বাজেট বাড়লে সেটিও হয়তো হয়ে যাবে।

মণ্ডপে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে তথ্যচিত্র একটানা দেখানো হবে। দর্শনার্থীদের তাই সাবধান থাকা ভালো। ধুনুচির ধোঁয়ার মধ্যে তাঁরা যদি ভুল করে ভাবেন এটি দুর্গাপুজো, পর্দায় মুখ্যমন্ত্রীর জীবনী তাঁদের দ্রুত সংশোধন করে দেবে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর্বে তাঁর তৃণমূল-জীবন কতটা দেখানো হবে, সেটি অবশ্য কৌতূহলের বিষয়। রাজনৈতিক জয়যাত্রার চিত্রনাট্যে দলবদলের অধ্যায়টি সাধারণত ‘আদর্শগত উত্তরণ’ নামে পরিচিত। পরিচালক চাইলে আবহসঙ্গীতে ব্যবহার করতে পারেন—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। শুধু মাঝপথে পতাকার রং বদলে যাবে।

বাঙালির উৎসবে রাজনীতি নতুন নয়। একসময় মণ্ডপে মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, কৃষক আন্দোলন বা নারী নির্যাতনের ছবি উঠে আসত। এখন মুখ্যমন্ত্রীর জীবনই থিম। আগে নেতারা পুজো উদ্বোধন করতেন; এখন তাঁরাই পুজোর প্রদর্শনী। ক্ষমতার সংস্কৃতিতে এটিই উন্নয়ন—ফিতে কাটার মানুষটি ক্রমে ফিতের দুই পাশ, কাঁচি এবং অনুষ্ঠান, সবই হয়ে ওঠেন।

দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসেন অসুরবধ করতে। কিন্তু রুবির মণ্ডপে কে দেবী, কে অসুর, কে নায়ক আর কে দর্শক—সব ভূমিকাই রাজনৈতিক ভাবে পূর্বনির্ধারিত। বুবাইয়ের জয়যাত্রায় দেবীর কাজ আপাতত আশীর্বাদ দেওয়া। ভোটাররা অবশ্য জানেন, রাজনৈতিক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় কোনও পুজো কমিটি লিখতে পারে না। সেটি লেখা হয় পাঁচ বছর অন্তর ভোটকেন্দ্রে।

তার আগে কলকাতা নিশ্চিন্তে মণ্ডপ দেখুক। দেবী প্রতি বছরই আসেন; মুখ্যমন্ত্রীর এমন আতশকাচ-নির্ভর মুসুর-ডাল সংস্করণ কিন্তু সচরাচর দেখা যায় না। আর ‘নন্দীগ্রাম থেকে নবান্ন’ পথটি সফল ভাবে মণ্ডপে ঢুকে পড়ার পরে ভবিষ্যতে নবান্ন থেকে কোথায়—তার জন্য উদ্যোক্তাদের পরের থিম পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।