এনআরএসের শৌচাগারে নার্সের রহস্যমৃত্যু, ওষুধের অতিমাত্রার ইঙ্গিত

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শৌচাগার থেকে কর্তব্যরত এক নার্সের অচেতন দেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।
- প্রাথমিক ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরে ওষুধের অতিমাত্রার প্রভাবের সম্ভাবনা ধরা পড়লেও, এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা না কি পরিকল্পিত কোনও অপরাধ—এখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না তদন্তকারীরা।
- ঘটনার নেপথ্যে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে কলকাতা পুলিশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শৌচাগার থেকে কর্তব্যরত এক নার্সের অচেতন দেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। মৃত নার্সের নাম রূপালি বর্মণ। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরে ওষুধের অতিমাত্রার প্রভাবের সম্ভাবনা ধরা পড়লেও, এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা না কি পরিকল্পিত কোনও অপরাধ—এখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না তদন্তকারীরা। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে কলকাতা পুলিশ।
বুধবার রাতে এনআরএসের স্ত্রীরোগ বিভাগের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট বা এইচডিইউ-তে কর্তব্যরত ছিলেন রূপালি। হাসপাতাল সূত্রের খবর, রোগীদের পরিচর্যার একটি পর্ব শেষ করার পরে তিনি শৌচাগারে যান। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলেও তিনি না ফেরায় সহকর্মীরা তাঁর খোঁজ শুরু করেন। শৌচাগারের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। একাধিক বার ডাকার পরেও কোনও সাড়া না মেলায় হাসপাতালের কর্মীরা দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকেন। সেখানে রূপালিকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
সহকর্মীরা দ্রুত তাঁকে চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে গেলেও শেষরক্ষা হয়নি। পরীক্ষার পরে চিকিৎসকেরা রূপালিকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। কর্তব্যরত অবস্থায় হাসপাতালের ভিতরেই একজন নার্সের এমন মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসক, নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
হাসপাতালের কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, উদ্ধারের সময় রূপালির চোখ, হাতের নখ এবং জিভের একটি অংশ নীলচে হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘সায়ানোসিস’ বলা হয়। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কমে গেলে এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাঁর হাতে ইঞ্জেকশন দেওয়ার চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই সমস্ত তথ্যের কোনওটিকেই এখনও মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসাবে ঘোষণা করেননি তদন্তকারীরা।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কয়েকটি সিরিঞ্জ, ওষুধের পাত্র এবং আরও কিছু সামগ্রী উদ্ধার করেছে। সেগুলি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সিরিঞ্জে কোন ওষুধ ছিল, সেই ওষুধের পরিমাণ কতটা এবং তার সঙ্গে রূপালির মৃত্যুর সরাসরি যোগ রয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হচ্ছে। ওই ওষুধ হাসপাতালের ভাণ্ডার থেকে নেওয়া হয়েছিল, না কি বাইরে থেকে আনা হয়েছিল, তা-ও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রূপালির পরিবারের অনুরোধে তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত এনআরএসে না করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে করানো হয়। প্রাথমিক ময়নাতদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ওষুধের অতিমাত্রায় তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ। বিষবিজ্ঞান, রোগতত্ত্ব এবং অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসার পরেই মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে।
রূপালির শরীরে আপাতদৃষ্টিতে কোনও বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল থেকে কোনও আত্মহত্যার বার্তাও উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ সূত্রে খবর। ফলে তদন্তকারীরা তিনটি সম্ভাবনাই খোলা রেখেছেন—ভুলবশত ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা গ্রহণ, আত্মহত্যা অথবা অন্য কারও হস্তক্ষেপে মৃত্যু। শৌচাগারের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ থাকার বিষয়টিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দরজা কী ধরনের ছিল এবং বাইরে থেকে সেটি কোনওভাবে বন্ধ করা সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করা হতে পারে।
হাসপাতালের নজরদারি ক্যামেরার ছবিও সংগ্রহ করছে পুলিশ। শৌচাগারে যাওয়ার আগে রূপালি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাঁর পিছনে অন্য কেউ গিয়েছিলেন কি না, তা বোঝার চেষ্টা চলছে। শৌচাগারে তিনি কতক্ষণ ছিলেন, সেই সময় ওই এলাকার কাছাকাছি কারা যাতায়াত করেছিলেন এবং তাঁর ব্যবহৃত ওষুধের সম্ভাব্য উৎস কী—এই সমস্ত তথ্য একত্র করা হচ্ছে।
রূপালি নিজে ইঞ্জেকশন নিয়েছিলেন, না কি অন্য কেউ তাঁকে ইঞ্জেকশন দিয়েছিলেন—তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন এখন এটিই। তাঁর মোবাইল ফোনের সাম্প্রতিক কথোপকথন, বার্তা এবং অন্যান্য তথ্যও প্রয়োজনে পরীক্ষা করা হতে পারে। পাশাপাশি তাঁর সহকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে তিনি সম্প্রতি কোনও মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা বা ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে ছিলেন কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
এনআরএস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শুক্রবার থেকে কমিটির সদস্যেরা হাসপাতালের কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা দফতরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রূপালির মৃত্যুর পরিস্থিতি ছাড়াও হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নিয়মে কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, কমিটি তা খতিয়ে দেখবে।
বিশেষত, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ওষুধ হাসপাতালের মজুতের অংশ হলে সেটি কীভাবে সেখানে পৌঁছল, কার অধিকারে ছিল এবং ওষুধ ব্যবহারের নথিতে তার উল্লেখ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। হাসপাতালের কোনও নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না এবং নিয়ন্ত্রিত ওষুধে কর্মীদের প্রবেশাধিকার যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয় কি না, তাও অভ্যন্তরীণ তদন্তের আওতায় রয়েছে।
রূপালির পরিবারের বক্তব্য, তাঁর জীবনে এমন কোনও সমস্যা ছিল বলে তাঁরা জানতেন না। পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের বাসিন্দা তাঁর বাবা অর্জুনচন্দ্র বর্মণ জানিয়েছেন, মৃত্যুর প্রায় ১৫ দিন আগে রূপালি পরিবারের কাছে গিয়েছিলেন। কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য তিনি আর্থিক সাহায্য চেয়েছিলেন। তাঁর বাবা ব্যাঙ্ক থেকে দুই লক্ষ টাকা তুলে মেয়েকে দিয়েছিলেন।
অর্জুনচন্দ্রের কথায়, সোমবার মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। রূপালি কারও সঙ্গে কোনও বিবাদে জড়িয়েছিলেন বলে পরিবারের জানা নেই। নতুন ফ্ল্যাট কেনার প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন পরিজনেরা। সেই কারণে মৃত্যুর পিছনে আত্মহত্যার সম্ভাবনা নিয়ে পরিবারের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সম্ভাবনাই পুরোপুরি নাকচ করা সম্ভব নয়।
তিন বছর আগে বেসরকারি সংস্থার কর্মী রাহুল দাসের সঙ্গে রূপালির আইনি বিয়ে হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে তাঁদের সামাজিক অনুষ্ঠান হয়। রাহুল জানিয়েছেন, বুধবার সন্ধ্যা প্রায় ৭টা ৪৫ মিনিটে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তার পরেই রূপালি রাতের কাজে যোগ দেন। তাঁর অনুরোধেই এনআরএসের বাইরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়।
রূপালির মৃত্যুর বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টার বা এআইইউটিইউসি। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক অশোক দাস বলেছেন, এই ঘটনা সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৪ সালে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালগুলির ভিতরে কথিত ‘হুমকির সংস্কৃতি’ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার যথাযথ নিরসন এখনও হয়নি।
সংগঠনটির দাবি, রূপালির মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি এবং কারণ নির্ধারণের জন্য বিচারবিভাগীয় তদন্ত করাতে হবে। সেই তদন্তের ফলও প্রকাশ্যে আনতে হবে। রূপালির পরিবারও রাজ্য সরকারের কাছে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আবেদন জানিয়েছে।
এখন তদন্তের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ফরেনসিক এবং বিষবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রতিবেদনের উপর। কোন ওষুধ তাঁর শরীরে প্রবেশ করেছিল, তার মাত্রা কত ছিল এবং সেই ওষুধই মৃত্যুর কারণ কি না—তা স্পষ্ট হলে রহস্যের জট অনেকটা খুলতে পারে। তত দিন পর্যন্ত ওষুধের অতিমাত্রা কেবল একটি প্রাথমিক সম্ভাবনা। রূপালির মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা না কি এর পিছনে অন্য কোনও ঘটনা রয়েছে—সেই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনও অধরা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



