Home International অস্ত্রে টান, পেন্টাগনের তাড়া

অস্ত্রে টান, পেন্টাগনের তাড়া

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
11 views 5 minutes read
A+A-
Reset

ওয়াশিংটন: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যত গড়াচ্ছে, ততই চাপ বাড়ছে আমেরিকার অস্ত্রভান্ডারে। গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ বার প্রতিরক্ষা শিল্পের উপর কার্যত ‘যুদ্ধকালীন’ চাপ তৈরি করল পেন্টাগন। অস্ত্র নির্মাতা সংস্থাগুলিকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহের সময়ও নাটকীয় ভাবে কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর হাতে আসা প্রতিরক্ষা দফতরের একটি স্মারক অনুযায়ী, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফাইনবার্গ অস্ত্র নির্মাতা সংস্থাগুলিকে ২১ দিনের মধ্যে নতুন উৎপাদন পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছেন।

ফাইনবার্গ বুধবার শিল্প সংস্থাগুলির কর্তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম তৈরির বর্তমান গতি আর মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর বার্তা, বছরের পর বছর ধরে অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে এখনই

এই নির্দেশ এমন সময়ে এল, যখন ইরান যুদ্ধের জেরে আমেরিকার অস্ত্রভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে আসা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষা দফতরের মধ্যে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। যদিও বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকার হাতে এখনও ‘‘বিপুল পরিমাণ’’ গোলাবারুদ রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন অস্ত্রও তৈরি করে পাঠানো হচ্ছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

প্রথম মাসেই ক্ষেপণাস্ত্রের ঝড়

ইরান যুদ্ধের প্রথম মাসেই আমেরিকা ৮৫০টির বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,০০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবহার করেছে। প্রথম কয়েক সপ্তাহেই মার্কিন বাহিনী আরও ১,৩০০টির বেশি কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ছিল প্রায় ২,২০০টি। গত সপ্তাহে সেই সংখ্যা কমে ৮২৭টির নীচে নেমেছে। থাড ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই ছবি—৪৫২ থেকে কমে মজুত দাঁড়িয়েছে ২৭৮টির নীচে

অস্ত্রভান্ডারে এই টান শুধু মার্কিন সেনাদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রেও হোয়াইট হাউসকে ভাবতে বাধ্য করছে।

২১ দিনের ‘ডেডলাইন’

ফাইনবার্গের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিকে এমন পরিকল্পনা দিতে হবে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র দ্রুত তৈরি এবং সরবরাহ করা যায়। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, কমাতে হবে দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ও।

পেন্টাগনের লক্ষ্য, অস্ত্র নির্মাতারা যেন শুধু সরকারি বরাতের দিকে তাকিয়ে না থাকে। বরং নিজেদের অর্থে কারখানা সম্প্রসারণ, নতুন উৎপাদন লাইন এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের কথাও ভাবতে হবে।

ফাইনবার্গের স্মারকে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনার সরকারি পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে কী ধরনের মূলধনী বিনিয়োগ এবং কারখানা সম্প্রসারণ প্রয়োজন, তা সংস্থাগুলিকে জানাতে হবে।

অর্থাৎ, সরকার এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। তবে বিনিয়োগের ঝুঁকির একটি অংশ বেসরকারি সংস্থাগুলিকেও নিতে হবে।

লকহিড-নর্থরপে ভরসা

অস্ত্রের ঘাটতি সামাল দিতে গত কয়েক মাস ধরেই একের পর এক পদক্ষেপ করছে পেন্টাগন। সোমবার নর্থরপ গ্রুম্যান এবং লকহিড মার্টিনের সঙ্গে একটি কাঠামোগত সমঝোতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। লক্ষ্য—প্যাট্রিয়ট অ্যাডভান্সড ক্যাপাবিলিটি-৩ (পিএসি-৩) এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো।

গত সপ্তাহেই লকহিড মার্টিনকে সর্বোচ্চ ৫৮.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি চুক্তি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন তিন গুণ করা।

মে মাসে অ্যান্ডুরিল, ক্যাস্টেলিয়ন, কোঅ্যাস্পায়ার, লেইডস এবং জোন ৫-এর মতো প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গেও পেন্টাগন কাঠামোগত সমঝোতা করেছে। উদ্দেশ্য তুলনামূলক কম খরচে ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত তৈরি করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আঘাত হানার ক্ষমতা বাড়ানো।

জুনের শেষ দিকে সিলিকন ভ্যালির একাধিক নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থার কর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে পেন্টাগন। অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠনে এই নতুন প্রজন্মের সংস্থাগুলিকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

আসল লড়াই কংগ্রেসে

তবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অর্থের। পেন্টাগনের তথাকথিত ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’গুলি আসলে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র কেনার চুক্তি নয়। এগুলি ভবিষ্যতে অস্ত্র কেনার পরিকল্পনার কাঠামো মাত্র। বাস্তবে সেই পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দ।

সিএসআইএস-এর মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের অধিকর্তা টম কারাকোর মতে, এই সমঝোতাগুলি মূলত ভবিষ্যতে চুক্তি করার প্রস্তুতি। কিন্তু এখনও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। আর সেখানেই বড় সমস্যা।

পেন্টাগনের পরিকল্পনার একটি বড় অংশ নির্ভর করছে ১.১৫ লক্ষ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রস্তাব কংগ্রেসে পাশ হওয়ার উপর। বিপুল ব্যয়বৃদ্ধির বিরোধিতা করে ডেমোক্র্যাটদের আপত্তিতে সেই প্রস্তাব আটকে রয়েছে।

কারাকোর মতে, গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা যদি কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের জটে আটকে যায়, তা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

হোয়াইট হাউসে অস্ত্র ব্যবসার বৈঠক

জুলাইয়ের শেষ দিকে আমেরিকার বড় পুরনো প্রতিরক্ষা সংস্থা এবং সিলিকন ভ্যালির নতুন অস্ত্র প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কর্তাদের হোয়াইট হাউসে ডাকা হয়েছিল।

বৈঠকে ছিলেন ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের অধিকর্তা রাসেল ভোট এবং হোয়াইট হাউসের আইনসভা বিষয়ক অধিকর্তা জেমস ব্রেড।

লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান, বোয়িং, অ্যান্ডুরিল এবং তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা প্যালান্টিরের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সংস্থাগুলির কর্তাদের সরাসরি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের পক্ষে সওয়াল করতে বলা হয়।

পেন্টাগনের ‘ওয়ার-টাইম’ মডেল

ফাইনবার্গের স্মারকের সত্যতা স্বীকার করেছেন পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল। তাঁর বক্তব্য, প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে উৎপাদনের গতি বাড়ানো নতুন কোনও নীতি নয়। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ফাইনবার্গের নির্দেশের প্রভাব পড়বে ২০২৮ অর্থবর্ষের প্রতিরক্ষা বাজেটেও

দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তালিকায় রয়েছে ‘নেক্সট জেনারেশন ইন্টারসেপ্টর’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ‘ন্যাশনাল অ্যাডভান্সড সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম’, ভ্রাম্যমাণ বিমান প্রতিরক্ষা রাডার, উন্নত পাইলট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং মহাকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও অনুসরণ করার প্রযুক্তি।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ আগেই বলেছেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পেন্টাগনের পুরনো অস্ত্র কেনার পদ্ধতি বদলাতে হবে। তাঁর মতে, মার্কিন শিল্প ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

এই সংস্কারের দায়িত্বে পেন্টাগনে আনা হয়েছে সিলিকন ভ্যালির একাধিক প্রাক্তন কর্তাকে। প্রাক্তন উবার কর্তা এমিল মাইকেল এখন প্রতিরক্ষা দফতরের গবেষণা ও প্রকৌশল বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি। প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন এবং অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

নিজের পকেটেই কারখানা বাড়াচ্ছে সংস্থা

কংগ্রেসে অর্থ বরাদ্দ আটকে থাকলেও কয়েকটি অস্ত্র নির্মাতা সংস্থা নিজেদের অর্থে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কারাকো। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য এই বিনিয়োগ যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যতে সরকারি বরাত নিশ্চিত না হলে সেই বিপুল বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

বিশেষ করে শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিকে শেয়ারহোল্ডারদের কাছেও জবাবদিহি করতে হয়।

সব মিলিয়ে ফাইনবার্গের স্মারকের বার্তা স্পষ্ট—ইরান যুদ্ধ মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের যে দুর্বলতা সামনে এনেছে, তা আর ধীরগতির সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। পেন্টাগন এখন প্রতিরক্ষা শিল্পকে কার্যত যুদ্ধকালীন উৎপাদন ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে চাইছে।

কিন্তু কারখানা বাড়ানো, উৎপাদন লাইন খোলা কিংবা নতুন প্রযুক্তি আনা গেলেও শেষ কথা বলবে কংগ্রেস। অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দ্রুত অনুমোদন না হলে প্যাট্রিয়ট, থাড এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কাগজেই আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles