বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যবয়সে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব এবং গড়ে প্রায় ১৩ বছর বেশি ডিমেনশিয়ামুক্ত জীবন পাওয়া যেতে পারে। এমনই দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সের মধ্যে স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখা, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত না হওয়া এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকা—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে ডিমেনশিয়া শুরু হওয়ার সময় অনেকটাই পিছিয়ে যেতে পারে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী Neurology-তে।

যুক্তরাষ্ট্রের এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথ-এর গবেষকেরা Atherosclerosis Risk in Communities (ARIC) নামে দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণায় হাজার হাজার মানুষের স্বাস্থ্য কয়েক দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

নতুন বিশ্লেষণে ১২,৪০৯ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য খতিয়ে দেখা হয়, যাঁদের গড় বয়স ছিল ৫৬ বছর এবং গবেষণার শুরুতে কারও ডিমেনশিয়া ছিল না। গবেষকেরা তিনটি ঝুঁকির বিষয়—উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং ধূমপান—পর্যালোচনা করেন। এরপর প্রায় ২৬ বছর ধরে তাঁদের অনুসরণ করা হয়।

এই সময়ের মধ্যে ৩,০০৮ জনের ডিমেনশিয়া হয় এবং ৫,২৩৮ জন ডিমেনশিয়া হওয়ার আগেই অন্য কারণে মারা যান।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের এই তিনটির কোনওটিই ছিল না, তাঁরা তিনটি ঝুঁকিই থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় গড়ে প্রায় ১৩ বছর বেশি ডিমেনশিয়ামুক্ত জীবন কাটিয়েছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী—

  • কোনও ঝুঁকি না থাকলে ডিমেনশিয়ামুক্ত জীবন ছিল গড়ে ৩০.১ বছর
  • একটি ঝুঁকি থাকলে ২৬.৩ বছর
  • দুটি ঝুঁকি থাকলে ২১ বছর
  • তিনটি ঝুঁকিই থাকলে তা নেমে আসে প্রায় ১৭ বছরে

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোনের অপ্টিমাল এজিং ইনস্টিটিউট-এর পরিচালক ডা. জোসেফ কোরেশ বলেন, মধ্যবয়স থেকেই এই ঝুঁকিগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখা মস্তিষ্কের সুস্থতা দীর্ঘদিন বজায় রাখার কার্যকর উপায় হতে পারে। তাঁর মতে, ৪৫ বছর বয়সের পর থেকেই ধূমপান ছাড়া এবং রক্তনালির স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্বজুড়ে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় তিনগুণ বেড়ে ১৫ কোটি ৩০ লক্ষে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ডিমেনশিয়ার প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রই প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব

আগের গবেষণায়ও বলা হয়েছে, শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তনযোগ্য ১৪টি ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ডিমেনশিয়ার প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘটনা ঠেকানো বা পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

বর্তমান গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ধূমপান—এই তিনটি ঝুঁকি সাধারণত মধ্যবয়সেই দেখা দেয় এবং এগুলির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মস্তিষ্কের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগের সঙ্গে জড়িত। তাই দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই গবেষণায় যুক্ত না থাকলেও Alzheimer’s Research UK-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান ডা. জ্যাকি হ্যানলি বলেন, শুধু ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি নয়, মানুষ কতদিন ডিমেনশিয়ামুক্ত জীবন কাটাতে পারবেন—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে গবেষণাটি, যা বাস্তব জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

তাঁর পরামর্শ, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ধূমপান এড়ানো এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা শুধু হৃদ্‌যন্ত্রের জন্যই নয়, মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমেনশিয়া সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় এখনও জানা না গেলেও, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং ডিমেনশিয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।