বাংলাস্ফিয়ার: ফিলিপাইনের ৩২ বছর বয়সি কীটতত্ত্ববিদ ক্রিশ্চিয়ান লুকানাস নিজের পরিচয় দেন এক অভিনব পরিচয়ে। তিনি তেলাপোকা নিয়ে গবেষণা করেন। আর সেই কারণেই দেশজুড়ে তিনি পরিচিত ‘ককরোচ লর্ড’ বা ‘তেলাপোকা সম্রাট’ নামে।
মানুষ যখন তাঁর পেশার কথা শোনে, বেশিরভাগই বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে, “তেলাপোকা নিয়েই গবেষণা? কেন?” কেউ আবার জানতে চায়, “ঈশ্বর কি সত্যিই তেলাপোকা সৃষ্টি করেছিলেন?” অনেকেই তাঁকে তেলাপোকা মারার উপায়ও জিজ্ঞেস করেন।
লুকানাসের বক্তব্য, মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গিই ভুল। তাঁর মতে, তেলাপোকা পৃথিবীর সবচেয়ে ভুল বোঝা প্রাণীগুলোর একটি।
তেলাপোকার প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা নতুন নয়। প্রাচীন মিশরীয়রাও এই পোকা তাড়াতে মন্ত্র ব্যবহার করত। এমনকি তেলাপোকা-ভীতির একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামও রয়েছে— কাটসারিডাফোবিয়া।
তবে লুকানাস বলেন, মানুষের রান্নাঘর, নর্দমা বা বাথরুমে দেখা জার্মান বা আমেরিকান তেলাপোকাই কেবল পরিচিত। অথচ পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির তেলাপোকা রয়েছে, যাদের অধিকাংশের সঙ্গে মানুষের কোনও সম্পর্কই নেই।
ফিলিপাইনের বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব দ্য ফিলিপিন্স লস বানিওস-এর গবেষক লুকানাসের অধিকাংশ সময় কাটে গভীর অরণ্য ও গুহায়। সেখানে তিনি নতুন প্রজাতির তেলাপোকা খুঁজে বের করেন এবং তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি জানান, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তেলাপোকার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মৃত জৈব পদার্থ পচিয়ে মাটিতে পুষ্টি ফিরিয়ে দেয়, টিকটিকি ও পাখির খাদ্য হিসেবে কাজ করে। আবার কিছু প্রজাতি বীজ ছড়ায় এবং পরাগায়ণেও সাহায্য করে।
অথচ লুকানাসের প্রথম পছন্দ ছিল মাছ নিয়ে গবেষণা করা। কিন্তু তাঁর অধ্যাপক তাঁকে কীটপতঙ্গ নিয়ে কাজ করতে উৎসাহ দেন। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন ফিলিপাইনের একটি গুহায় তিনি আবিষ্কার করেন এক নতুন প্রজাতির সোনালি রঙের তেলাপোকা।
এই প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম নক্টিকোলা গনজালেজি। নামটি রাখা হয় তাঁর শিক্ষক হুয়ান কার্লোস টি. গনজালেজের সম্মানে। তবে স্থানীয়ভাবে এটি পরিচিত ‘গোল্ড ককরোচ’ নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের কিংবদন্তির সঙ্গে মিল রেখেই এই নামকরণ।
এরপর লুকানাস ফিলিপাইনের আরও আটটি নতুন তেলাপোকার প্রজাতির আনুষ্ঠানিক বর্ণনা দিয়েছেন। পাশাপাশি অন্য দেশের ছয়টি নতুন প্রজাতি শনাক্ত করতেও অংশ নিয়েছেন। তিনি কয়েকটি প্রজাতির নাম রেখেছেন টলকিনের উপন্যাসের চরিত্র এবং পোকেমন সিরিজের চরিত্রদের নামে।
তাঁর মতে, তেলাপোকার জগৎ অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্যময়। কিছু প্রজাতি উজ্জ্বল নীল, হালকা সবুজ বা ধাতব রঙের। কেউ দেখতে গুবরে পোকার মতো, কেউ আবার ক্রিকেট পোকার মতো লাফাতে পারে। এমনও আছে, যারা গোল হয়ে গুটিয়ে যেতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পেরিসফেয়ারাস গণের স্ত্রী তেলাপোকা। তারা সন্তানদের প্রতি বিরল মাতৃত্বের পরিচয় দেয়। সদ্যোজাত বাচ্চারা মায়ের দেহে ছোট ছিদ্র করে রক্ত পান করে বেড়ে ওঠে। স্তন্যপান নয়, কিন্তু অনেকটা সেই ধরনেরই এক পুষ্টি জোগানোর ব্যবস্থা— যা কীটপতঙ্গের জগতে অত্যন্ত বিরল।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, উইপোকাও আসলে তেলাপোকারই একটি সামাজিক শাখা। পিঁপড়ের মতোই তারা সংগঠিত সমাজ গড়ে তোলে। যদিও মানুষ তাদের মূলত ঘরবাড়ির ক্ষতিকর পোকা হিসেবেই দেখে।
কিন্তু বনাঞ্চলে উইপোকা মৃত কাঠ পচিয়ে তার পুষ্টি আবার মাটিতে ফিরিয়ে দেয়। এই কাজ না হলে বনজ বাস্তুতন্ত্রে পুষ্টির পুনর্ব্যবহারই সম্ভব হতো না।
অনেকের ধারণা, তেলাপোকা প্রায় অবিনাশী। সত্যিই গৃহস্থালির কিছু প্রজাতি নানা প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু বনের তেলাপোকারা ততটা শক্তিশালী নয়।
লুকানাসের মতে, বন উজাড়, খনি প্রকল্প এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের অস্তিত্ব আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
বিশ্বজুড়েই অমেরুদণ্ডী প্রাণী, বিশেষ করে কীটপতঙ্গ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সংরক্ষণ তহবিলের অধিকাংশই ব্যয় হয় বাঘ, হাতি বা পান্ডার মতো আকর্ষণীয় প্রাণীদের জন্য। তেলাপোকার মতো প্রাণীরা প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়।
ফিলিপাইনে ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো দুটি গুহাবাসী তেলাপোকাকে বিপন্ন এবং আরও পাঁচটি প্রজাতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্ত করা হয়। তার আগে এদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যই ছিল না।
বর্তমানে ফিলিপাইনে অন্তত ১৩০টি তেলাপোকার প্রজাতি পরিচিত। তবে লুকানাসের বিশ্বাস, আরও অসংখ্য প্রজাতির অস্তিত্ব এখনও মানুষের অজানা।
তাঁর কথায়, “আমরা এখনও জানিই না, কত তেলাপোকা পরাগায়ণ করে, কতগুলো বীজ ছড়ায়, কিংবা তারা প্রকৃতিতে আর কী কী ভূমিকা পালন করে। যত গবেষণা এগোবে, ততই নতুন বিস্ময় সামনে আসবে।”
যে প্রাণীকে মানুষ এতদিন কেবল নোংরা, বিরক্তিকর ও ধ্বংসযোগ্য বলে মনে করেছে, সেই তেলাপোকাই হয়তো পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার অন্যতম নীরব কর্মী— এমনটাই মনে করেন ‘তেলাপোকা সম্রাট’ ক্রিশ্চিয়ান লুকানাস।