Home খবর মৌসুমি আকাশের ‘এয়ার পকেট’: কেন হঠাৎ ৩০০ ফুট নামতে পারে বিমান?

মৌসুমি আকাশের ‘এয়ার পকেট’: কেন হঠাৎ ৩০০ ফুট নামতে পারে বিমান?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
17 views 6 minutes read
A+A-
Reset

বর্ষার টার্বুলেন্স কতটা বিপজ্জনক? কেন হয় আকস্মিক উচ্চতা পরিবর্তন, কীভাবে পরিস্থিতি সামলান পাইলটরা—জানুন সহজ ভাষায়

বর্ষাকালে বিমানে যাত্রার সময় হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি বা টার্বুলেন্স অনেকের কাছেই আতঙ্কের কারণ। কখনও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিমান প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়, যা যাত্রীদের কাছে ভয়াবহ মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যিই কি বিমান তখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর ‘না’। বরং এটি বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক অস্থিরতার ফল, আর আধুনিক যাত্রীবাহী বিমান এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই তৈরি।

টার্বুলেন্স আসলে কী?

টার্বুলেন্স হল বায়ুমণ্ডলের অস্থির বায়ুপ্রবাহ। সাধারণ অবস্থায় বিমান তুলনামূলক স্থির বায়ুস্তরে উড়ে। কিন্তু হঠাৎ কোথাও বাতাসের গতি বা দিক বদলে গেলে বিমান ঝাঁকুনি অনুভব করে।

একে অনেকটা উত্তাল সমুদ্রে জাহাজ চলার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সমুদ্র যেমন সব সময় শান্ত থাকে না, তেমনই আকাশও সবসময় মসৃণ নয়।

কেন বর্ষাকালেই ঝুঁকি বেশি?

ভারতের মৌসুমি বায়ু বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্প বহন করে। দিনের তাপে এই আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে বিশাল বজ্রগর্ভ (কিউমুলোনিম্বাস) মেঘ তৈরি করে।

এই মেঘের ভেতরে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী (Updraft) এবং নিম্নমুখী (Downdraft) বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়। অনেক সময় এই বায়ুর গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি হতে পারে।

যদি বিমান এই বায়ুপ্রবাহের মধ্যে পড়ে, তাহলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার উচ্চতা দ্রুত ওঠানামা করতে পারে। যাত্রীদের কাছে সেটি হঠাৎ পড়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে।

৩০০ ফুট নিচে নামা কি বিপজ্জনক?

শুনতে ভয়ঙ্কর লাগলেও সব সময় নয়।

বিমান চলাচলের ভাষায় ৩০০ ফুট উচ্চতার পরিবর্তন অস্বাভাবিক হলেও সেটি দুর্ঘটনার লক্ষণ নয়। আধুনিক বিমানের ডানা, কাঠামো এবং ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম এমন চাপ সামলানোর মতো করেই নকশা করা হয়।

অটোপাইলট ও পাইলট মিলে খুব দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ফলে যাত্রীরা যতটা আতঙ্ক অনুভব করেন, বাস্তবে বিমানের জন্য ঝুঁকি সাধারণত তার চেয়ে অনেক কম।

টার্বুলেন্সের ধরন

সব টার্বুলেন্স এক রকম নয়। প্রধান কয়েকটি ধরন হল—

  • বজ্রগর্ভ মেঘজনিত টার্বুলেন্স (বর্ষাকালে সবচেয়ে সাধারণ)
  • পাহাড়ি বায়ুপ্রবাহজনিত টার্বুলেন্স
  • জেট স্ট্রিমের কারণে সৃষ্ট ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স (CAT)
  • তাপমাত্রার তারতম্যজনিত টার্বুলেন্স

এর মধ্যে ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স সবচেয়ে কঠিন, কারণ এটি অনেক সময় রাডারেও ধরা পড়ে না।

যাত্রীরা আহত হন কেন?

টার্বুলেন্সে বিমানের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়া খুবই বিরল।

আঘাত পান মূলত সেই যাত্রীরা, যাঁদের সিটবেল্ট বাঁধা থাকে না। বিমান হঠাৎ নিচে নামলে শরীর জড়তার কারণে উপরের দিকে ছিটকে যেতে পারে। মাথা কেবিনের ছাদ বা লাগেজ রাখার বক্সে আঘাত লাগতে পারে।

এই কারণেই অনেক বিমান সংস্থা সিটবেল্ট সাইন নিভে যাওয়ার পরও কোমরে বেল্ট বাঁধা রাখার পরামর্শ দেয়।

পাইলটরা কীভাবে পরিস্থিতি সামলান?

উড্ডয়নের আগেই পাইলটরা বিস্তারিত আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। আকাশে ওঠার পর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এবং আশপাশের বিমানের কাছ থেকেও টার্বুলেন্সের তথ্য পান।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়ানো সম্ভব হলে তারা পথ বা উচ্চতা বদলান। তা সম্ভব না হলে বিমানের গতি কমিয়ে এমন পর্যায়ে আনা হয়, যাতে কাঠামোর উপর চাপ কম পড়ে। একই সঙ্গে যাত্রীদের বসে সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছে?

আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে শক্তি ও জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। এর জেরে ভবিষ্যতে প্রবল বজ্রঝড় এবং তীব্র টার্বুলেন্সের ঘটনাও বাড়তে পারে।

তবে কোনও নির্দিষ্ট বিমানের একটি ঘটনার জন্য সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা যায় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রবণতা।

যাত্রীদের কী করা উচিত?

  • সিটে থাকলে সবসময় সিটবেল্ট আলগাভাবে হলেও বাঁধা রাখুন।
  • কেবিন ক্রুদের নির্দেশ মেনে চলুন।
  • টার্বুলেন্স শুরু হলে আসন ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করবেন না।
  • ওভারহেড বিন খুলবেন না।
  • শিশুদের নিরাপদভাবে ধরে রাখুন।

শেষ কথা

বর্ষাকালের টার্বুলেন্স যতই নাটকীয় মনে হোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি বিমানের জন্য নয়, সিটবেল্ট না বাঁধা যাত্রীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক যাত্রীবাহী বিমান এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই নকশা করা হয়। তাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিমান ৩০০ ফুট নিচে নেমে গেলেও সেটি সাধারণত নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা নয়। আতঙ্ক নয়, সিটবেল্ট বাঁধাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles