Home খবর ভোট নয়, চাপের রাজনীতি! কোথায় দাঁড়িয়ে সিজেপি?

ভোট নয়, চাপের রাজনীতি! কোথায় দাঁড়িয়ে সিজেপি?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
16 views 5 minutes read
A+A-
Reset

রাজনৈতিক দল নয়, ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবেই পথচলার ঘোষণা অভিজিৎ দীপকের; কী এই মডেল, কতটা কার্যকর হতে পারে?

নির্বাচনে লড়াই নয়, বরং সরকার ও প্রশাসনের উপর জনমতের চাপ তৈরি করাই এখন লক্ষ্য। এমনটাই জানিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, আপাতত রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। বরং সিজেপি একটি ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবেই জনস্বার্থের ইস্যুতে আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—প্রেশার গ্রুপ কী? রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য কোথায়? আর ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা সিজেপি ঠিক কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে?

প্রেশার গ্রুপ কী?

রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পরিভাষায়, প্রেশার গ্রুপ এমন একটি সংগঠন, যার লক্ষ্য ক্ষমতা দখল করা নয়; বরং সরকার, আইনসভা বা প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা।

তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকার গঠন করতে চায় না। পরিবর্তে আন্দোলন, গণস্বাক্ষর অভিযান, বিক্ষোভ, জনমত গঠন, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া বা তথ্যভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে চাপ সৃষ্টি করে।

সহজভাবে বলতে গেলে, রাজনৈতিক দল ক্ষমতা চায়, প্রেশার গ্রুপ চায় নীতির পরিবর্তন।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

সবচেয়ে বড় পার্থক্য লক্ষ্য ও দায়বদ্ধতায়।

রাজনৈতিক দলকে অর্থনীতি, শিক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই অবস্থান জানাতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোটে লড়তে হয়।

অন্যদিকে, প্রেশার গ্রুপ সাধারণত এক বা কয়েকটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে ঘিরেই কাজ করে। শিক্ষা, পরিবেশ, কৃষি, শ্রমিক অধিকার, দুর্নীতি, নাগরিক স্বাধীনতা কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা জনমত গড়ে তোলে এবং সরকারের উপর চাপ বাড়ায়।

বিশ্বজুড়ে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রেশার গ্রুপ নতুন কোনও ধারণা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক আইন, জলবায়ু নীতি কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বিভিন্ন শক্তিশালী লবি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি নীতিতে প্রভাব ফেলছে। ব্রিটেনে শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলিও একইভাবে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতেও কৃষক সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, পরিবেশবাদী গোষ্ঠী, নাগরিক আন্দোলন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন বহুদিন ধরেই কার্যত প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করছে।

সিজেপির অবস্থান কোথায়?

সিজেপির উত্থান মূলত পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহির দাবিকে কেন্দ্র করে।

নিট-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে যে ছাত্র আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠে এই সংগঠন। বিক্ষোভ, অনশন, গণসমাবেশ এবং সামাজিক মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমে বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনায় তুলে আনাই ছিল তাদের প্রধান সাফল্য।

সাম্প্রতিক বৈঠকের পর অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, সিজেপি আপাতত ভোটের রাজনীতিতে নামবে না। বরং জনস্বার্থের বিভিন্ন প্রশ্নে আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানোই হবে সংগঠনের মূল লক্ষ্য। ঝাড়খণ্ডের চলমান ছাত্র আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণাও সেই কৌশলেরই অংশ। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, সোনম ওয়াংচুক সংগঠনের ‘মেন্টর’ হিসেবেই থাকবেন।

সুবিধা কোথায়?

প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করার বড় সুবিধা হল নির্বাচনী রাজনীতির চাপ নেই।

ভোটব্যাঙ্ক, জোট বা সরকার গঠনের সমীকরণ না ভেবেই তারা দ্রুত কোনও ইস্যুতে অবস্থান নিতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট দাবিকে ঘিরে জনমত সংগঠিত করা তুলনামূলক সহজ হয় এবং আন্দোলনের ফোকাসও স্পষ্ট থাকে।

সীমাবদ্ধতাও আছে

তবে ক্ষমতার বাইরে থাকারও মূল্য আছে।

সরকারে না থাকায় কোনও নীতি সরাসরি কার্যকর করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের প্রভাব পুরোপুরি নির্ভর করে জনসমর্থন, গণমাধ্যমের নজর, আদালতের হস্তক্ষেপ এবং সরকারের উপর চাপ তৈরির সক্ষমতার উপর। আন্দোলনের গতি কমে গেলে বা জনসমর্থন হ্রাস পেলে সেই প্রভাবও দ্রুত কমে যেতে পারে।

সামনে বড় পরীক্ষা

এখন সিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি শুধুই পরীক্ষা ও ছাত্রস্বার্থকেন্দ্রিক সংগঠন হয়ে থাকবে, নাকি কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি, পরিবেশ বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির মতো বৃহত্তর ইস্যুতেও ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে?

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, অনেক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে, আবার অনেক সংগঠন দীর্ঘদিন সফল প্রেশার গ্রুপ হিসেবেই প্রভাব বিস্তার করেছে। সিজেপির ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে একটি বিষয়ের উপর—নির্বাচনী রাজনীতিতে না গিয়েও তারা কতটা ধারাবাহিকভাবে জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে এবং সরকারের নীতিতে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles