অভিযুক্তের বাবার বিস্ফোরক দাবি— ‘ছেলে মূল অপরাধী নয়’; পাল্টা সিবিআই বলছে, প্রমাণের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন দাবি, পাল্টা দাবি এবং আরও জটিল প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্যতম অভিযুক্তের বাবা এবার দাবি করেছেন, তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে।
তাঁর কথায়, “আমার ছেলে মূল অভিযুক্ত নয়। সে অন্য একজনের ছায়াসঙ্গীর মতো থাকত। সেই কারণেই তাকে ফাঁসানো হয়েছে।” তাঁর দাবি, ছেলে কোনও বড় অপরাধচক্রের সদস্য নয়; স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ওঠাবসার কারণেই তদন্তের জালে জড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের অভিযোগ, প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করতেই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছে তাঁদের ছেলেকে।
অন্যদিকে, সিবিআই এই দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, প্রযুক্তিগত তথ্য, ফরেনসিক প্রমাণ এবং জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে অভিযুক্তদের। তদন্তকারীদের মতে, এটি কোনও আকস্মিক হামলা নয়; বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। এর পিছনে আরও বড় কোনও চক্র বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চন্দ্রনাথ রথ দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রাক্তন কর্মী রথ সক্রিয় রাজনীতিতে না থাকলেও শুভেন্দুর সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাজের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন। বিজেপির অন্দরমহলে তাঁকে অনেকেই শুভেন্দুর ‘ছায়াসঙ্গী’ বলেই চিনতেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে সাংগঠনিক বৈঠক— প্রায় সর্বত্রই শুভেন্দুর পাশে দেখা যেত তাঁকে।
গত ৬ মে রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে দুষ্কৃতীদের গুলিতে নিহত হন চন্দ্রনাথ রথ। তদন্তকারীদের দাবি, ভুয়ো নম্বরপ্লেট লাগানো একটি গাড়ি তাঁর গাড়ির পথ আটকে দেয়। এরপর মোটরবাইকে আসা আততায়ীরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, হামলার আগে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখা হয়েছিল।
ঘটনার পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। তাঁর বক্তব্য, “চন্দ্রনাথ আমার সঙ্গে যুক্ত না থাকলে হয়তো তাঁকে প্রাণ দিতে হতো না।” তাঁর অভিযোগ, এটি ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
একই সুর শোনা গিয়েছে চন্দ্রনাথ রথের পরিবারের বক্তব্যেও। তাঁর মা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকেই তাঁর ছেলেকে খুন করা হয়েছে। তবে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বদলে দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পক্ষেই মত দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমি একজন মা হিসেবে কারও মৃত্যুদণ্ড চাই না, কিন্তু কঠোরতম শাস্তি চাই।”
এখন একদিকে অভিযুক্তের পরিবারের দাবি— তাঁদের ছেলেকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। অন্যদিকে সিবিআই বলছে, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি; আরও কয়েকজনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সূত্রও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
ফলে চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি খুনের মামলা নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত তদন্তে পরিণত হয়েছে। সিবিআইয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ, চার্জশিট এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে— আসল ষড়যন্ত্রকারী কারা, আর কে সত্যিই বলির পাঁঠা।