Home International হুমকি থেকে আলোচনা—ইরান নীতিতে ট্রাম্পের দোলাচল

হুমকি থেকে আলোচনা—ইরান নীতিতে ট্রাম্পের দোলাচল

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
14 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হামলার হুঁশিয়ারি, শেষ মুহূর্তে পিছু হটা, তারপর ফের আলোচনার ডাক—ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিতে ক্রমেই বাড়ছে ধোঁয়াশা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু হামলার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ থাকার কথা জানিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছু হটলেন তিনি। শনিবার রাতে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর রবিবার ফের জানালেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নিউ জার্সি থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার এবং ইরান—সব পক্ষই তাঁকে হামলা না চালানোর অনুরোধ করেছে। তাঁর দাবি, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সোমবার থেকেই আলোচনা শুরু হতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতা।

কিন্তু এখানেই প্রশ্নের শেষ নয়, বরং শুরু।

বারবার একই নাটক?

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গত পাঁচ মাসে ট্রাম্পের ইরান নীতিতে একই ধরনের ওঠানামা বারবার দেখা গেছে। কখনও সামরিক হামলার কড়া হুমকি, আবার পরক্ষণেই আলোচনার সম্ভাবনার কথা—শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবে ওয়াশিংটন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তাঁর উপদেষ্টারা সতর্ক করেছিলেন, সংঘাত আরও বাড়লে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে।

এবারও হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন স্পষ্ট করেনি, ঠিক কী কারণে ইরান আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে—বা আদৌ রাজি হয়েছে কি না। ফলে মার্কিন আইনপ্রণেতা, কূটনীতিক এবং পশ্চিম এশিয়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প কি সত্যিই যুদ্ধের ইতি টানার রাস্তা খুঁজছেন, নাকি চাপ ও আলোচনার মধ্যে দোদুল্যমান হয়েই কৌশল ঠিক করছেন?

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক খালেদ এলগিন্দির মতে, পরিস্থিতি অনেকটা “অচল গলিতে ঢুকে পড়ার” মতো। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ট্রাম্পের অবস্থান অনেক সময় শেষ যে ব্যক্তির সঙ্গে তিনি কথা বলেন, তার পরামর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে—কখনও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, কখনও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমন।

রিয়াদের ফোনে বদলে গেল সুর?

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সপ্তাহান্তে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরই ট্রাম্প নতুন হামলা থেকে সরে আসেন। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অন্যদিকে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করেন। সেই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের নতুন হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে জুলাই মাসে ওই ঘাঁটিতে একাধিক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন।

এদিকে ইরানের বন্দরগুলিতে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ এখনও কার্যকর রয়েছে। তবে গত সপ্তাহের মাঝামাঝি ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার পর নতুন করে কোনও মার্কিন বিমান হামলা হয়নি।

ঘরেও বাড়ছে অস্বস্তি

ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের একাংশও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করছেন।

লুইজিয়ানার সিনেটর জন কেনেডি বলেন, প্রেসিডেন্টের ফের বোমাবর্ষণ শুরু করা উচিত কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সামরিক গোয়েন্দা তথ্য তাঁর হাতে নেই। তবে তাঁর আশঙ্কা, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি—দুই-ই বাড়বে এবং তার সরাসরি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

কেনেডির আরও সতর্কবার্তা, ইরানের শাসকদের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

ওহাইওর রিপাবলিকান সাংসদ মাইকেল টার্নারও প্রশাসনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় কংগ্রেসের সদস্যদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন।

হোয়াইট হাউস অবশ্য এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকার করেছে।

যুদ্ধ, না কি রাজনৈতিক বার্তা?

অনেক বিশ্লেষকের চোখে, ট্রাম্পের এই হুমকি-পিছু হটা-আলোচনার চক্র শুধুমাত্র সামরিক কৌশল নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তার হিসাবও রয়েছে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসির মতে, ট্রাম্পের ধারণা ছিল ইরান দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং চাপ বাড়ালেই তারা আত্মসমর্পণ করবে। বাস্তবে তা ঘটেনি। তবু ট্রাম্প এখনও এমন একটি “সিদ্ধান্তমূলক আঘাত”-এর সন্ধান করছেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের বদলে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ইরান-সংক্রান্ত আলোচনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার সাম্প্রতিক মাসগুলিতে এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলির কথায়, বর্তমান পরিস্থিতির দায় প্রশাসনেরই। এখন ট্রাম্পকে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। তবে একই পদ্ধতি বারবার অনুসরণ করে যে সমাধান আসবে, সে বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সন্দিহান।

এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংকটের আবহে রবিবার নিউ জার্সির গলফ ক্লাবে সময় কাটিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে তিনি দাবি করেছেন, একটি গলফ প্রতিযোগিতায় ৭০ স্কোর করে জিতেছেন। সঙ্গে তাঁর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য—“এটাকে প্রতিভা বলে। আমার আছে, অন্যদের নেই।”

ইরানকে ঘিরে যখন ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মিত্র, প্রতিপক্ষ এবং মার্কিন আইনপ্রণেতা—সবারই অপেক্ষা, তখন ট্রাম্পের বার্তা আপাতত একটাই: হামলার হুমকি থাকছে, আলোচনার দরজাও খোলা—কিন্তু কোন দরজায় তিনি শেষ পর্যন্ত ঢুকবেন, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles