Table of Contents
হরমুজ খুলবে, পরমাণু হুমকি কমবে? মিত্রদের অনুরোধে ইরানে নতুন হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্টের
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থামাতে সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, পশ্চিম এশিয়ার মিত্র দেশগুলির সঙ্গে আলোচনায় যুদ্ধের অবসানের একটি সম্ভাব্য কাঠামো তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার নির্দেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, সম্ভাব্য সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে, সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থেকে তৈরি হুমকির অবসান ঘটানোর বিষয় রয়েছে।
তিনি লেখেন, মিত্রদের অনুরোধ এবং “বিশ্বের ভবিষ্যৎ স্বার্থে” আপাতত হামলা বাতিল করতে রাজি হয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে দ্রুত একটি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার শর্তে।
ট্রাম্প আরও জানান, ইজরায়েলও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই উদ্যোগে অংশ নিতে রাজি হয়েছে। লক্ষ্য, ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
সৌদি যুবরাজের ফোন, বদলাল ট্রাম্পের সুর?
ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগে শনিবার সৌদি আরবের যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সলমন ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তির দাবি, ওই ফোনালাপে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ জানান যুবরাজ। প্রথম এই কথোপকথনের খবর প্রকাশ করে অ্যাক্সিওস।
সৌদি আরবের আশঙ্কা ছিল, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের মার্কিন হামলা হলে তেহরান পাল্টা সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলির তেল ও গ্যাস পরিকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে।
ফোনালাপে যুবরাজ ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, ইরানের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের নতুন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দুই নেতার কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করেছেন।
হামলাও, আলোচনার ডাকও
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের একাধিক অস্ত্র ও রসদঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলায় অংশ নিয়েছিল সৌদি আরব।
তবে একই সময়ে রিয়াদ ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
এরই মধ্যে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং যুবরাজের ভাই খালিদ বিন সলমন ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্প ও মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সেখানে ইরান-সংক্রান্ত কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ভিন্ন সুর
অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-র সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি ছিল তাঁদের প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ। বৈঠকে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।
অর্থাৎ, একদিকে ইজরায়েলের কাছ থেকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের চাপ, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় মিত্রদের যুদ্ধ না বাড়ানোর বার্তা—এই দুই বিপরীত চাপের মধ্যেই ট্রাম্পের নীতি বারবার দিক বদলাচ্ছে।
প্রতিশোধের হুমকি থেকে আলোচনার টেবিলে
সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় মার্কিন বাহিনী। এরপরই ট্রাম্প প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
শুক্রবারও সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কঠোরভাবে আঘাত করবে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাপ বজায় রাখবে।
কিন্তু মাত্র এক দিন পরেই তাঁর অবস্থানে বড় পরিবর্তন দেখা গেল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট অবশ্য দাবি করেছেন, ইরান এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেও পরে তা ভেঙেছে। তাঁর অভিযোগ, এরপর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং মার্কিন সেনাদেরও হত্যা করেছে।
সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ক্রমশ বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। পাশাপাশি তেলের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির উপরও সংঘাতের প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ আরও বাড়ালে তার রাজনৈতিক মূল্য কতটা দিতে হবে, সেই প্রশ্নও ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।
নাগরিকদের সতর্ক করল আমেরিকা
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পশ্চিম এশিয়ার ১০টি দেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
বাহরাইন, ইজরায়েল, ইরাক, জর্ডন, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া, আকাশপথ সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অন্যান্য ভ্রমণ-সংক্রান্ত সমস্যার জন্যও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
ফলে ট্রাম্প নতুন হামলা আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা করলেও যুদ্ধ সত্যিই শেষের পথে, নাকি এটি আরও বড় সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতি—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।