ইরান সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর বিমানবন্দরে দুটি মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন মার্কিন সাংবাদিক ম্যাক্স ব্লুমেনথাল। তাঁর দাবি, সাংবাদিকতার কারণে তাঁকে নিশানা করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলিরও আশঙ্কা, সরকারের সমালোচক সাংবাদিকদের উপর চাপ তৈরির প্রবণতার এটি আরেকটি উদাহরণ হতে পারে।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দ্য গ্রেজোন-এর প্রতিষ্ঠাতা ব্লুমেনথাল কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানে গিয়েছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্য কভার করতে।
তেহরানের একটি ক্যাফেতে বসে প্রতিবেদন ও ভিডিও আপলোড করার সময় তাঁর নজরে আসে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী কর্মী লরা লুমারের একাধিক সামাজিক মাধ্যম পোস্ট। একটি পোস্টে লুমার দাবি করেছিলেন, ব্লুমেনথাল যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলে তাঁকে যেন মার্কিন মার্শালরা বিমান থেকে নামিয়ে আটক করেন।
ব্লুমেনথালের কথায়, “তখনই বুঝেছিলাম, দেশে ফিরলে আমাকে হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে।”
বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ, তারপর ফোন বাজেয়াপ্ত
গত ১০ জুলাই ভার্জিনিয়ার ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর সীমান্ত নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে ‘সেকেন্ডারি ইনস্পেকশন’-এর জন্য আলাদা করে নিয়ে যান।
তাঁর ইরান সফরের খরচ কে বহন করেছেন, সেখানে যাঁরা তাঁকে আতিথ্য দিয়েছেন তাঁদের তিনি চেনেন কি না এবং ভবিষ্যতে আবার ইরানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কি না—এমন একাধিক প্রশ্ন করা হয় বলে জানান ব্লুমেনথাল।
এরপর তাঁর দুটি মোবাইল ফোন দেখতে চান কর্মকর্তারা। ব্লুমেনথাল পাসওয়ার্ড দিতে অস্বীকার করলে ফোন দুটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
তবে তাঁর ল্যাপটপ বা ডিজিটাল ক্যামেরা নেওয়া হয়নি।
প্রায় এক সপ্তাহ পর, আদালতে জরুরি আবেদন দায়েরের ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ফোন দুটি তাঁকে ফিরিয়ে দেয় সরকার। সরকারের বক্তব্য, ফোনগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাঙতে তারা পারেনি। ফলে আদালতে করা আবেদনটির আর প্রয়োজন নেই।
ফোন ফেরত পেলেও লড়াই থামাননি
কিন্তু ফোন ফিরে পাওয়ার পরও বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে রাজি হননি ব্লুমেনথাল।
তিনি ফের আদালতের দ্বারস্থ হন। বুধবার ফেডারেল বিচারক লিওনি এম. ব্রিঙ্কেমা সরকারকে নির্দেশ দেন, ফোন দুটি কার কাছে ছিল, কতদিন তাদের হেফাজতে ছিল এবং সেই সময়ে সেগুলির সঙ্গে কী করা হয়েছিল—তা আদালতকে জানাতে হবে।
এই তথ্য জমা দেওয়ার জন্য সরকারকে ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
ব্লুমেনথালের আইনজীবীদের দাবি, ফোন বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি তার মধ্যে থাকা তথ্য কপি বা বিশ্লেষণের চেষ্টাও করা হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের মতে, এ ধরনের তল্লাশি চালাতে আদালতের পরোয়ানা প্রয়োজন।
শুনানিতে বিচারকও সাম্প্রতিক একটি রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের ‘উন্নত তল্লাশি’ চালাতে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক। তবে এই মামলায় এমন কোনও পরোয়ানা দেখানো হয়নি বলে আদালতে উঠে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
এই ঘটনায় সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফ্রিডম অব দ্য প্রেস ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র সেথ স্টার্নের মতে, ঘটনাটি গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন যেসব সাংবাদিকের প্রতিবেদন পছন্দ করে না, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সীমান্ত তল্লাশিকেও সেই কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
মার্কিন-আরব বৈষম্যবিরোধী কমিটির সভাপতি জেনিন ইউনেসও প্রশ্ন তুলেছেন—যদি সাধারণ নিরাপত্তা পরীক্ষা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে শুধু মোবাইল ফোনই কেন বাজেয়াপ্ত করা হল, ল্যাপটপ বা ক্যামেরা নয়?
তাঁর আশঙ্কা, কর্মকর্তাদের আগ্রহ হয়তো ব্লুমেনথালের যোগাযোগের তালিকা, তথ্যসূত্র, ব্যক্তিগত বার্তা কিংবা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের দিকে ছিল।
শুনানিতে বিচারকও উল্লেখ করেন, ব্লুমেনথাল একজন সাংবাদিক হওয়ায় বিষয়টির গুরুত্ব আলাদা। সম্প্রতি সাংবাদিকদের তথ্যসূত্র সংগ্রহের চেষ্টা নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-সংক্রান্ত একটি ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
ফোনে হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি?
এখন বড় প্রশ্ন, বাজেয়াপ্ত করার সময় ব্লুমেনথালের ফোনে কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ বা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছিল কি না।
বিচারক পরামর্শ দিয়েছেন, বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ফোন দুটি পরীক্ষা করিয়ে দেখা যেতে পারে। তাতে কোনও অনুপ্রবেশ বা পরিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে কি না, তা বোঝা যেতে পারে।
ব্লুমেনথাল জানিয়েছেন, তিনি সেই পরীক্ষা করানোর চেষ্টা করছেন। তবে এর খরচ যথেষ্ট বেশি হওয়ায় প্রক্রিয়াটি সহজ নয়।
ইউনেসের দাবি, খামেনেইয়ের শেষকৃত্য কভার করতে সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস-সহ একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ইরানে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিমানবন্দর তল্লাশি বা ফোন বাজেয়াপ্ত করার ঘটনা প্রকাশ্যে আসেনি।
‘আমার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই নিশানা’
ব্লুমেনথালের অভিযোগ, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সাংবাদিকতার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
তাঁর ভাষায়, “আমি একজন ইহুদি এবং জায়নবাদবিরোধী—এই অবস্থানও আমাকে লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে।”
তাঁর মতে, আদালতের এই হস্তক্ষেপ শুধু তাঁর নিজের অধিকার রক্ষার বিষয় নয়। ভবিষ্যতে একই ধরনের সরকারি চাপের মুখে পড়তে পারেন এমন অন্যান্য সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তদন্তসংক্রান্ত বিশেষাধিকারের যুক্তি দেখিয়ে ফোন দুটির হেফাজত ও ব্যবহারের সব তথ্য প্রকাশে আপত্তি জানানো হতে পারে।
ফলে ফোন ফেরত পেলেও ব্লুমেনথালের আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং সামনে আরও বড় প্রশ্ন—সাংবাদিকের ডিজিটাল গোপনীয়তা ও সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার সীমা ঠিক কোথায়?