Table of Contents
হাইলাইটস:
- সোনম ওয়াংচুকের অনশন ও ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আন্দোলন সংসদের বাইরে জনমতকে নাড়া দিলেও, তার অভিঘাত পড়ছে লোকসভার ভিতরেও।
- তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনের ফলে বিরোধী শিবিরের সংখ্যাতত্ত্ব ও নেতৃত্বের সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
- সিজেপি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস, বাম, আঞ্চলিক দল এবং নতুন বিরোধী শক্তিগুলির মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।
- সরকারের বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থানের চেষ্টা থাকলেও, বিরোধীদের সামনে নেতৃত্ব, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠে এসেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির যন্তর-মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের অনশন, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ডাকা বিক্ষোভ, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল রাজধানী— এই আবহেই শুরু হয়েছে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। সংসদের বাইরে যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার সমান্তরালে লোকসভার ভিতরেও বদলে গিয়েছে বিরোধী রাজনীতির মানচিত্র।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন। দলের একাংশ আলাদা হয়ে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ায় লোকসভায় বিরোধী জোটের শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে। সংসদে সংখ্যার অঙ্ক যেমন নতুনভাবে সাজানো হয়েছে, তেমনই বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব, কৌশল এবং অগ্রাধিকারের প্রশ্নেও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম থেকেই বিরোধীরা সিজেপি আন্দোলন, সোনম ওয়াংচুকের অনশন, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, পরীক্ষা দুর্নীতি এবং ছাত্র আন্দোলনের বিষয়গুলি সংসদে তুলতে চাইছে। কিন্তু সেই ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের আড়ালেই রয়েছে একাধিক মতভেদ।
সংসদের বাইরে আন্দোলন, ভিতরে নতুন অঙ্ক
সিজেপি-র আন্দোলন মূলত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহির দাবিতে শুরু হলেও, তা ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে। বিরোধী দলগুলির একাংশ প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু সংসদের ভিতরে এই সমর্থন একরকম নয়।
কংগ্রেস আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে। বাম দলগুলি ছাত্র-যুব অসন্তোষের সঙ্গে নিজেদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা খুঁজে পাচ্ছে। অন্যদিকে কয়েকটি আঞ্চলিক দল সরকারের সমালোচনা করলেও আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি নিজেদের যুক্ত করতে সতর্ক।
এই অবস্থায় তৃণমূলের ভাঙন বিরোধী সমন্বয়কে আরও জটিল করে তুলেছে।
তৃণমূল ভাঙনের অভিঘাত
একসময় লোকসভায় কংগ্রেসের পরে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠগুলির মধ্যে ছিল তৃণমূল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভাঙনের ফলে সেই অবস্থান আর আগের মতো নেই।
লোকসভায় নতুনভাবে বিরোধী আসনবিন্যাস, বিভিন্ন সংসদীয় কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব এবং বিতর্কে বক্তৃতার সময় বণ্টন— সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে।
তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের নতুন অবস্থান শুধু সংখ্যার হিসাব পাল্টায়নি; বিরোধী রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্রও স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছে।
কে নেতৃত্ব দেবে বিরোধীদের?
সংসদের বাইরে জনআন্দোলন যত জোরদার হচ্ছে, ততই বিরোধীদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে— এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মুখ কে?
কংগ্রেস জাতীয় স্তরে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলির অনেকেই মনে করছে, আন্দোলনের শক্তিকে কোনও একক দলের নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত নয়।
সিজেপি নিজেও বারবার দাবি করেছে, তারা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে থেকে জনস্বার্থের প্রশ্ন তুলছে। ফলে বিরোধী দলগুলিও আন্দোলনের সমর্থন জানালেও তার নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার অবস্থায় নেই।
ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাত
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কৃষক আন্দোলনের পরে এত বড় পরিসরে ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণ খুব কমই দেখা গিয়েছে।
সিজেপি আন্দোলনের মূল ভিত্তি শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষা, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। ফলে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হয়ে থাকেনি; বহু ছাত্র, তরুণ পেশাজীবী এবং অভিভাবকের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধীরা আন্দোলনের রাজনৈতিক সম্ভাবনা বুঝতে পারলেও, সেটিকে দলীয় রাজনীতির ছকে ফেলার ঝুঁকিও নিতে চাইছে না।
সরকারের কৌশল
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট— আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সংসদের কার্যক্রম চালানোই অগ্রাধিকার।
সরকারি শিবিরের দাবি, আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পুলিশ আইন মেনেই ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে সরকার সংসদে নিজেদের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।
তবে বিরোধীরা প্রতিদিনই স্থগিতাদেশের নোটিস, আলোচনার দাবি এবং প্রতিবাদের মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিরোধী ঐক্যের সীমাবদ্ধতা
সংসদের বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও, বিরোধীদের মধ্যে কৌশলগত ঐক্য এখনও অসম্পূর্ণ।
কেউ সংসদ অচল করার পক্ষে, কেউ ধারাবাহিক বিতর্কের মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখতে চায়। আবার কয়েকটি আঞ্চলিক দল নিজেদের রাজ্যের ইস্যুকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে একদিকে সরকারের বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থান তৈরি হলেও, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সামনে কী?
বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম কয়েক দিনই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংসদের ভিতরে ও বাইরে— দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হতে চলেছে।
সিজেপি আন্দোলন যদি আরও বিস্তৃত জনসমর্থন পায়, তবে বিরোধীরা সেটিকে সরকারের বিরুদ্ধে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের নিজেদের মধ্যেও নেতৃত্বের প্রশ্ন, কৌশলের প্রশ্ন এবং ভবিষ্যতের জোট রাজনীতির প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।
তৃণমূলের ভাঙনের পরে লোকসভার নতুন সমীকরণ সেই বিতর্ককে আরও গভীর করেছে। সংখ্যার অঙ্ক বদলানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্র কোথায় তৈরি হবে— সংসদের ভিতরে, না কি সংসদের বাইরের জনআন্দোলনের মধ্যে।
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক সপ্তাহের জাতীয় রাজনীতির গতিপথ অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে।