Table of Contents
হাইলাইটস:
- অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতল স্পেন।
- ১০ জনের আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে প্রায় আক্রমণই গড়ে তুলতে পারেনি; ১১৫ মিনিট পর্যন্ত গোলমুখে কার্যত কোনও শট ছিল না।
- স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
- লিওনেল মেসির বিদায়ী বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গ; ম্যাচ শেষে আবেগ সামলাতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
- খেলা শেষে লিয়ান্দ্রো পারেদেস লাল কার্ড দেখেন; পুরস্কার বিতরণীতেও আর্জেন্টিনার আচরণ বিতর্কের জন্ম দেয়।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক ফাইনালই নাটকীয় হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ফাইনালটি ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের। এটি ছিল ফুটবল দর্শনের লড়াই—একদিকে বল দখল, ধৈর্য, সমন্বয় ও পরিকল্পনার উপর দাঁড়িয়ে থাকা স্পেন; অন্যদিকে লিওনেল মেসিকে ঘিরে গড়ে ওঠা আর্জেন্টিনা।
শেষ পর্যন্ত জয় হল স্পেনের ফুটবল দর্শনের। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল স্পেন। ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি উঠল লা রোজার হাতে।
নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। বল দখল, পাসের জাল, অবস্থান বদল—সব ক্ষেত্রেই লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল ছিল অনেক বেশি সংগঠিত। আর্জেন্টিনা কার্যত নিজেদের অর্ধেই আটকে পড়ে।
স্পেনের রক্ষণভাগ পুরো টুর্নামেন্টেই ছিল দুর্ভেদ্য। আট ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে। সেই দৃঢ়তারই পুনরাবৃত্তি দেখা গেল ফাইনালেও। আর্জেন্টিনা গোলের সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ম্যাচের ১১৫ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য শটই নিতে পারেনি।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে আসে ম্যাচের একমাত্র গোল। ১০৬তম মিনিটে ডান দিক থেকে পেদ্রো পোর্রোর উঁচু ক্রসে বদলি নিকো উইলিয়ামস অসাধারণ হেডে বল ফেরান। সেই বল পেয়ে ফেরান তোরেস জোরালো শটে জাল কাঁপিয়ে দেন। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষকের কোনও সুযোগই ছিল না।
এই গোলের পরই স্পেন বুঝে যায়, বিশ্বকাপ তাদের হাতছাড়া হবে না।
লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে একাধিকবার শেষ মুহূর্তের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন করেছে। নক-আউট পর্বের কোনও ম্যাচেই তারা নির্ধারিত সময়ে এগিয়ে ছিল না। কিন্তু ফাইনালে সেই অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের গল্প আর লেখা হল না।
ম্যাচের শেষদিকে বদলি খেলোয়াড় জুলিয়ানো সিমিওনে একটি অর্ধসুযোগ পেলেও শট অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। এরপরই শেষ বাঁশি।
বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার। একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় লিওনেল মেসির রূপকথার বিদায়ের আশা। ম্যাচ শেষে সমর্থকদের দিকে তাকিয়ে চোখের জল আটকাতে পারেননি তিনি।
২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ—পরপর তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের পর এবার প্রথমবার নক-আউট পর্বে হারল আর্জেন্টিনা। ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার পর কোনও নক-আউট ম্যাচে তাদের এটি ছিল প্রথম পরাজয়।
তবে ম্যাচ শেষের পর আর্জেন্টিনার আচরণ নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। বদলি খেলোয়াড় লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরায় লাল কার্ড দেখেন। পুরস্কার বিতরণীর সময়ও বহু আর্জেন্টাইন ফুটবলার স্পেনের খেলোয়াড়দের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের সমর্থকদের দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
অন্যদিকে স্পেনের আনন্দ ছিল সীমাহীন। অধিনায়ক রদ্রি, যিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন, সতীর্থদের সঙ্গে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। ২০১০ সালের ইনিয়েস্তা-জাভি-ভিয়াদের উত্তরসূরিরা এভাবেই নিজেদের নতুন সোনালি যুগের সূচনা ঘোষণা করল।
মাঠের বাইরে উদ্বোধনী ও বিরতির জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান যতই দর্শকদের বিনোদন দিক, মাঠের খেলায় শেষ পর্যন্ত একটাই দল সত্যিকারের ফুটবল খেলেছে—আর সেই দলটির নাম স্পেন।
এটি ছিল এক দর্শনের, এক ফুটবল-পরিচয়ের এবং অটল বিশ্বাসের জয়। ২০১০ সালের কিংবদন্তি স্প্যানিশ দলের উত্তরসূরিরা এবারও বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করল। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেনের নতুন প্রজন্ম উল্লাসে ভেসে গেল।
ফাইনালে শুরু থেকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত মাঠে একমাত্র স্পেনই নিজেদের ফুটবল খেলেছে। আর্জেন্টিনা ছিল অস্বাভাবিক রক্ষণাত্মক। এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখার আগেই লিওনেল স্কালোনির দল কার্যত আক্রমণের ইচ্ছা ত্যাগ করেছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ম্যাচের ১১৫ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি।
স্পেন প্রতিপক্ষকে খেলতেই দেয়নি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই তাদের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ছিল সাফল্যের ভিত্তি। আট ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে।
প্রশ্ন ছিল একটাই—আকাশি-সাদা রক্ষণ ভেদ করতে পারবে কি না স্পেন। কিন্তু তারা নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবলই খেলেছে—দীর্ঘ সময় বল দখল, নিখুঁত পাস, সমন্বিত চলাফেরা এবং ধৈর্য। অবশেষে সেই উত্তর মিলল অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ে তোরেসের স্বর্ণগোল
১০৬ মিনিটে এল ম্যাচের একমাত্র গোল। পেদ্রো পোরোর দুর্দান্ত ক্রস থেকে বদলি নিকো উইলিয়ামস হেড করে বল নামিয়ে দেন। আরেক বদলি ফেরান তোরেস জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জোরালো শটে বল জালে পাঠান।
গোল হতেই স্কালোনিকে প্রায় কেঁদে ফেলতে দেখা যায়। পুরো নকআউট পর্বেই শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় বেঁচে ছিল আর্জেন্টিনা। ৯০ মিনিটের মধ্যে কোনও নকআউট ম্যাচেই তারা এগিয়ে ছিল না। এবার সেই ভাগ্য আর সঙ্গ দিল না।
শেষদিকে বদলি জুলিয়ানো সিমেওনে একটি অর্ধসুযোগ নষ্ট করেন। তাতেই শেষ হয়ে যায় ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নদের শিরোপা রক্ষার স্বপ্ন। সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা লিওনেল মেসিকে ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে সমর্থকদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়।
মেসি ও তাঁর সতীর্থরা এর আগে টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্ট—দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ—জিতেছিলেন। ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার পর কোনও নকআউট ম্যাচে হারেনি আর্জেন্টিনা। কিন্তু এবার তারা প্রাপ্য ফলই পেয়েছে।
ম্যাচ শেষে উত্তেজনা
শেষ বাঁশির পর পরিস্থিতি আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। বদলি লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরায় লাল কার্ড দেখেন।
পরাজয়ের পর আর্জেন্টিনার আচরণও বিতর্কের জন্ম দেয়। ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানে স্পেনের ফুটবলারদের দিকে না তাকিয়ে তারা মাঠের এক প্রান্তে নিজেদের সমর্থকদের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আলোচনায় ছিলেন। স্পেন অধিনায়ক রদ্রি যখন ছয় কিলোগ্রাম ওজনের সোনার বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলতে যাচ্ছেন, তখনও ট্রাম্প মঞ্চ ছাড়তে দেরি করেন, যা অনেকের চোখে অস্বস্তিকর দৃশ্য হয়ে ওঠে।
জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, কিন্তু মাঠে একতরফা লড়াই
মার্কিন মাটিতে বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠান ছিল আড়ম্বরপূর্ণ। উদ্বোধনী পরিবেশনায় ছিলেন জেনিফার হাডসন। টম ক্রুজ ফুটবল নিয়ে বক্তৃতা দেন। নির্ধারিত সময়ের ছয় মিনিট পরে খেলা শুরু হয়। বিরতিতেও ছিল বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু মাঠের খেলায় সেই জৌলুসের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
ম্যাচের শুরুতে একমাত্র উল্লেখযোগ্য সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। উনাই সিমন এগিয়ে এসে মেসির উদ্দেশে বাড়ানো হুলিয়ান আলভারেসের পাস ক্লিয়ার করেন। বল আবার আলভারেসের কাছেই এলেও তাঁর প্রথম স্পর্শ খারাপ হওয়ায় সুযোগ নষ্ট হয়। এরপর আক্রমণে আর কার্যত কিছুই করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
রদ্রির নিয়ন্ত্রণে স্পেন
পুরো ম্যাচে বলের দখল ছিল স্পেনের। মাঝমাঠে রদ্রি ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। লামিনে ইয়ামালও একাধিকবার প্রতিভার ঝলক দেখান। শুরুতেই তাঁর একটি শট অল্পের জন্য বাইরে যায়।
স্পেন ক্রমাগত উঁচুতে উঠে চাপ সৃষ্টি করে, বল কেড়ে নেয় এবং আক্রমণ গড়ে তোলে। দ্বিতীয়ার্ধে জলপানের বিরতির পর সুযোগের পর সুযোগ তৈরি হতে থাকে। কিন্তু গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস একের পর এক অসাধারণ সেভ করে দলকে বাঁচিয়ে রাখেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেভের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১।
স্কালোনি আরও রক্ষণাত্মক কৌশল নেন। ১০১ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসকে তুলে মার্কোস সেনেসিকে নামিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণ সাজান।
এনজোর লাল কার্ড
৮৩ মিনিটে প্রতিবাদের জন্য হলুদ কার্ড দেখেছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। পরে পাউ কুবারসির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ এবং লাল কার্ড দেখেন তিনি। ফলে শেষদিকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
এর আগে মার্তিনেস লামিনে ইয়ামালের ফ্রি-কিক ঠেকিয়ে অতিরিক্ত সময় নিশ্চিত করেছিলেন। এছাড়া তিনি পাউ কুবারসি, আইমেরিক লাপোর্তে এবং নিকো উইলিয়ামসের শটও রুখে দেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্যম্ভাবী গোল
অতিরিক্ত সময়ে স্পেন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। একবার নিকো উইলিয়ামস গোল করলেও মিকেল মেরিনোর ফাউলের কারণে তা বাতিল হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, নিকোলাস ওতামেন্দি সামান্য সংস্পর্শেই পড়ে যান।
মেরিনো পরে সহজ অবস্থান থেকেও হেড বাইরে মারেন। কিন্তু স্পেনের চাপ এতটাই বাড়ছিল যে গোলটি যেন সময়ের অপেক্ষা মাত্র ছিল।
অবশেষে ফেরান তোরেস সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটান। পরে আরেকবার বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়। তবে তাঁর ১০৬ মিনিটের গোলই স্পেনকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
বল দখল
- স্পেন: ৬৭%
- আর্জেন্টিনা: ৩৩%