Table of Contents
‘দ্য হান্ট ফর গোলাম’-এর শ্বেতাঙ্গ কাস্টিং বিতর্কে নতুন প্রশ্ন
হাইলাইটস
- অ্যান্ডি সার্কিসের দাবি, টলকিনের নর্স পুরাণ-প্রভাবিত জগতের কারণেই নতুন Lord of the Rings ছবিতে মূলত শ্বেতাঙ্গ অভিনেতাদের নেওয়া হয়েছে।
- সমালোচকদের মতে, কাস্টিংয়ের সিদ্ধান্তের দায় টলকিনের ওপর চাপানো ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক—দুই দিক থেকেই দুর্বল যুক্তি।
- পিটার জ্যাকসনের চলচ্চিত্র-ধারাবাহিকের সঙ্গে দৃশ্যগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যাখ্যাই বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারত।
- সাহিত্য থেকে সিনেমা—শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রূপান্তরই পরিচালকের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও সৃজনশীল সিদ্ধান্তের ফল।
হলিউডে কাস্টিং নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই বিতর্কের ভাষা এবং মানদণ্ড।
আশির দশকের শুরুতে এমন বহু কাস্টিং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা আজ প্রায় অকল্পনীয়। ১৯৮০ সালে Flash Gordon-এ ম্যাক্স ফন সিডো মিং দ্য মার্সিলেসের চরিত্রে এবং ১৯৮১ সালে Charlie Chan and the Curse of the Dragon Queen-এ পিটার উস্তিনভকে চার্লি চ্যানের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। সে সময়ও সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেই সিদ্ধান্তগুলি আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন কোনও বড় বাজেটের ফ্যান্টাসি ছবিতে প্রায় সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ অভিনেতাদের কাস্ট করা হলে নির্মাতাদের সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হয়।
ঠিক সেই পরিস্থিতির মুখেই পড়েছেন অ্যান্ডি সার্কিস। তাঁর পরিচালিত The Lord of the Rings: The Hunt for Gollum মুক্তির আগেই কাস্টিং নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সার্কিসের ব্যাখ্যা, বিতর্কের সূচনা
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সার্কিসকে প্রশ্ন করা হয়, কেন ছবির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রেই শ্বেতাঙ্গ অভিনেতাদের নেওয়া হয়েছে।
জবাবে তিনি বলেন, জে. আর. আর. টলকিনের মধ্য-পৃথিবী মূলত নর্স পুরাণ দ্বারা প্রভাবিত। তাঁর মতে, শায়ার এমন একটি সমাজ, যা “খুবই শ্বেতাঙ্গ” এবং বাইরের মানুষদের প্রতি খুব বেশি আগ্রহী নয়।
তিনি আরও জানান, শুধুমাত্র রাজনৈতিক শুদ্ধতার খাতিরে বা “বক্সে টিক” দেওয়ার জন্য বৈচিত্র্যময় কাস্টিং করা হবে না। যেখানে গল্পের প্রয়োজন, সেখানেই তা করা হবে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যাই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
টলকিনকে কি সত্যিই দায়ী করা যায়?
সমালোচকদের প্রশ্ন, টলকিন কি সত্যিই ২০২৬ সালের একটি চলচ্চিত্রের কাস্টিং নিয়ে কোনও নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন?
বাস্তবতা হলো, The Lord of the Rings লেখার সময়কার ব্রিটেন আজকের মতো বহু-জাতিগোষ্ঠীর সমাজ ছিল না। টলকিনের মনোযোগ ছিল ভাষা, পুরাণ, ইতিহাস এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য কাল্পনিক জগৎ নির্মাণে।
ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রে কোন জাতিগোষ্ঠীর অভিনেতা কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন—এমন প্রশ্ন তাঁর ভাবনার মধ্যেই ছিল না।
এই কারণেই সমালোচকদের মতে, বর্তমান কাস্টিংয়ের সিদ্ধান্তকে টলকিনের ব্যক্তিগত ইচ্ছা হিসেবে তুলে ধরা যথেষ্ট দুর্বল যুক্তি।
আরও শক্তিশালী ব্যাখ্যা ছিল হাতের কাছেই
অনেকের মতে, সার্কিস যদি বলতেন যে তিনি পিটার জ্যাকসনের চলচ্চিত্র-ত্রয়ীর সঙ্গে দৃশ্যগত ও নান্দনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান, তাহলে সেটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতো।
কারণ The Hunt for Gollum সেই একই সিনেমাটিক জগতের সম্প্রসারণ। দুই দশকেরও বেশি আগে জ্যাকসনের তৈরি মধ্য-পৃথিবীর ভিজ্যুয়াল ভাষার ওপর দাঁড়িয়েই নতুন ছবিটি নির্মিত হচ্ছে।
আর সেটাই সম্ভবত কাস্টিংয়ের সবচেয়ে বাস্তব কারণ।
টলকিনকেও তো হুবহু অনুসরণ করা হয়নি
এখানেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে।
পিটার জ্যাকসনের Lord of the Rings ত্রয়ীও কিন্তু টলকিনের বইকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেনি। গল্পের সময়রেখা, চরিত্রের উপস্থাপনা এবং বহু ঘটনায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
তাহলে শুধুমাত্র অভিনেতাদের বর্ণের ক্ষেত্রে টলকিনকে কঠোরভাবে অনুসরণ করার দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত?
টলকিন অবশ্য মধ্য-পৃথিবীর উত্তর-পশ্চিম অংশকে ইউরোপ-সদৃশ অঞ্চল হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। হবিটনের অবস্থানকে তিনি অক্সফোর্ডের অক্ষাংশের কাছাকাছি এবং মিনাস তিরিথকে ফ্লোরেন্স বা রাভেন্নার সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। দক্ষিণাঞ্চলে অপেক্ষাকৃত গাঢ় বর্ণের মানুষের উপস্থিতির কথাও তাঁর লেখায় রয়েছে।
কিন্তু সেটাই কি চূড়ান্ত নির্দেশ?
তাহলে সাত ফুট লম্বা মানুষ কোথায়?
যদি বইয়ের প্রতিটি শারীরিক বর্ণনাই হুবহু পর্দায় তুলে ধরতে হয়, তাহলে বিতর্ক আরও অনেক দূর গড়াতে পারে।
টলকিনের নুমেনোরীয়রা প্রায় সাত ফুট লম্বা, অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী এক জাতি। এলফরা প্রায় শব্দহীনভাবে বরফের ওপর হাঁটতে পারে, মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি জ্ঞানী এবং কার্যত অমর।
তাহলে কি তাঁদের চরিত্রে সাধারণ মানুষের অভিনয়ই অনুপযুক্ত?
এই প্রশ্ন তুলেই সমালোচকরা মনে করিয়ে দেন, সাহিত্য থেকে সিনেমায় রূপান্তরের সময় বাস্তবতা, প্রযুক্তি এবং পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি—সব মিলিয়েই নতুন ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
সেক্ষেত্রে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু কি সত্যিই হওয়া উচিত, কোনও এলফ চরিত্রে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা ইসমায়েল ক্রুজ কর্দোভাকে নেওয়া হয়েছে কি না?
একই বিতর্ক নোলানের ‘ওডিসি’ ঘিরেও
এই ধরনের আলোচনা শুধু Lord of the Rings-এ সীমাবদ্ধ নয়।
ক্রিস্টোফার নোলানের আসন্ন The Odyssey ছবিতেও হেলেন অব ট্রয়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন লুপিতা নিয়ঙ্গ’ও।
অন্যদিকে ছবির অধিকাংশ অভিনেতাই ব্রিটিশ বা মার্কিন, সংলাপ আধুনিক ইংরেজিতে, অনেকের উচ্চারণও আমেরিকান। অথচ কাহিনির পটভূমি প্রাচীন গ্রিস—যেখানে একচোখো দৈত্য, সমুদ্রদানব, সাইরেনের মতো পৌরাণিক চরিত্রের উপস্থিতি রয়েছে।
তবু বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে মূলত একজন কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রীর কাস্টিং।
শেষ কথা
এই বিতর্ক একটি বড় সত্য সামনে নিয়ে আসে।
সাহিত্য থেকে সিনেমায় রূপান্তর কখনও নিছক অনুবাদ নয়; এটি পরিচালকের নিজস্ব ব্যাখ্যা। কেউ সময় বদলান, কেউ চরিত্র, কেউ ভাষা, আবার কেউ দৃশ্যের বিন্যাস।
পিটার জ্যাকসন যেমন নিজের দৃষ্টিতে টলকিনকে পর্দায় এনেছিলেন, তেমনই ক্রিস্টোফার নোলান হোমারের Odyssey-কে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছেন।
অ্যান্ডি সার্কিসও তাঁর ছবির জন্য নিজের মতো কাস্টিং করার পূর্ণ স্বাধীনতা রাখেন।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে টলকিনের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা নির্দেশ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা—সমালোচকদের মতে—অপ্রয়োজনীয় এবং দুর্বল যুক্তি। শেষ পর্যন্ত কাস্টিংয়ের দায় বা কৃতিত্ব পরিচালকেরই, লেখকের নয়।