হাইলাইটস:
- লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাসের আগে মহারাষ্ট্রে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে এনসিপির দুই শিবিরকে এক করার পক্ষে বিজেপি।
- সুনেত্রা পাওয়ার শিবির অর্থ মন্ত্রক এবং জাতীয় সভাপতি পদ দাবি করায় আলোচনা জটিল।
- এনসিপির প্রবীণ নেতাদের একাংশ ক্ষমতা ভাগাভাগিতে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের পক্ষে।
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি ও মুম্বই—দুই স্তরেই একাধিক দফায় আলোচনা চলছে।
বাংলাস্ফিয়ার: লোকসভা কেন্দ্রগুলির সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে যখন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তখন মহারাষ্ট্রে নিজেদের জোটকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে এনসিপির দুই শিবিরকে এক করার উদ্যোগে জোর দিয়েছে বিজেপি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, আগামী দিনে আসনসংখ্যার পরিবর্তন হলে মহারাষ্ট্রে একটি ঐক্যবদ্ধ এনসিপি তাদের জোটকে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে।
বর্তমানে এনসিপির ভাঙনের ফলে দলটি কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত। একটি অংশ ক্ষমতাসীন জোটের অংশীদার, অন্য অংশ আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। এই বিভাজনের ফলে একই সামাজিক ভিত্তি এবং ভোটব্যাঙ্কে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জোট রাজনীতির জন্য অস্বস্তিকর বলে মনে করছে বিজেপি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির কৌশলবিদদের ধারণা, ডিলিমিটেশনের পরে মহারাষ্ট্রে লোকসভা আসনের সংখ্যা বাড়লে প্রতিটি আসনের রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়বে। সেই পরিস্থিতিতে একাধিক শরিক দলের মধ্যে ভোটের বিভাজন না ঘটিয়ে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ এনসিপি বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটকে আরও কার্যকরভাবে লড়াই করার সুযোগ করে দেবে।
তবে একীকরণের পথে বড় বাধা হয়ে উঠেছে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্ন। সুনেত্রা পাওয়ার ঘনিষ্ঠ শিবির আলোচনায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধু প্রতীকী সমঝোতায় তারা রাজি নয়। তাদের দাবি, রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ দফতর তাদের হাতে থাকতে হবে। পাশাপাশি এনসিপির জাতীয় সভাপতির পদও তাদের শিবিরের নেতৃত্বের হাতে দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এই দাবিগুলি স্বাভাবিকভাবেই অন্য শিবিরের নেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। এনসিপির প্রবীণ নেতাদের একাংশ মনে করছেন, যদি কোনও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতেই হয়, তবে তা হতে হবে মর্যাদা ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে। এক পক্ষের হাতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দিলে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে দলকে আবারও অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেবে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন বলছে, বিজেপিও এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। তাই তারা কোনও পক্ষের উপর সমঝোতা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে উভয় শিবিরই নিজেদের রাজনৈতিক সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে।
বিজেপির এই উদ্যোগের পিছনে কেবল মহারাষ্ট্রের রাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্কও রয়েছে। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের কয়েকটি রাজ্যে লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে মহারাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে শক্তিশালী জোট বজায় রাখা বিজেপির কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিলিমিটেশনের পরে যদি আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তবে নতুন কেন্দ্রগুলিতে সংগঠন, প্রার্থী নির্বাচন এবং সামাজিক সমীকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেখানে বিভক্ত আঞ্চলিক দলের তুলনায় ঐক্যবদ্ধ সংগঠন অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। বিজেপি সম্ভবত সেই হিসাব মাথায় রেখেই এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে।
অন্যদিকে, এনসিপির ভিতরেও এই সম্ভাব্য একীভবন নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। একাংশের মতে, দীর্ঘমেয়াদে দলকে টিকিয়ে রাখতে ঐক্যই একমাত্র পথ। কারণ বিভক্ত অবস্থায় সংগঠন দুর্বল হয়, কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং ভোটারদের কাছেও স্পষ্ট বার্তা পৌঁছায় না।
আবার অন্য অংশের আশঙ্কা, শুধুমাত্র নির্বাচনী লাভের জন্য তড়িঘড়ি একীভবন করলে পুরনো দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। নেতৃত্বের প্রশ্ন, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, প্রার্থী বাছাই এবং সম্পদের বণ্টন—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা থাকবে।
বিজেপি অবশ্য প্রকাশ্যে এই আলোচনার বিষয়ে খুব বেশি মন্তব্য করতে চাইছে না। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, মহারাষ্ট্রে জোটকে আরও স্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন শরিক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এনসিপির দুই শিবিরের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে তা শুধু মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় স্তরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক আঞ্চলিক দল ভাঙনের মুখে পড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে একটি বড় আঞ্চলিক দলের পুনর্মিলন জোট রাজনীতির নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
তবে আপাতত আলোচনার পথ এখনও দীর্ঘ। সুনেত্রা শিবিরের ক্ষমতা-সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে অন্য শিবিরের ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারিত্বের প্রত্যাশার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় ঘটানো যায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দিল্লি ও মুম্বই—উভয় স্তরেই আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের ধারণা, ডিলিমিটেশনকে সামনে রেখে আগামী কয়েক মাসে এই আলোচনার গতি আরও বাড়তে পারে। কারণ আসন পুনর্বিন্যাসের আগে জোটের ভিত মজবুত করতে পারলে ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণে তা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিজেপির বর্তমান উদ্যোগ সেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।