Table of Contents
হাইলাইটস:
- ২০০৭ সালে ইউনিসেফের ক্যালেন্ডারের জন্য তোলা এক ছবিতে চার মাসের লামিনে ইয়ামালকে স্নান করাচ্ছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি।
- প্রায় দুই দশক পরে, সেই দুই মানুষই ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার জার্সিতে একে অপরের প্রতিপক্ষ।
- স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এই ঘটনাকে কেবল কাকতালীয় নয়, “ঈশ্বরের অদৃশ্য পরিকল্পনা” বলেই মনে করেন।
- মেসির উত্তরসূরি হিসেবে ইয়ামালের নাম উচ্চারিত হলেও, স্প্যানিশ তরুণের দাবি—তিনি নিজের পথেই হাঁটতে চান।
বাংলাস্ফিয়ার: “হয়তো লিওনেল মেসি জীবনে অনেক শিশুকেই কোলে নিয়েছেন, হয়তো সবটাই কাকতালীয়। কিন্তু যারা বিশ্বাস করে, যারা মনে করে দৃশ্যমান জগতের বাইরেও কিছু আছে, তাদের কাছে ‘কাকতালীয়’ আসলে ঈশ্বরের ছদ্মনাম।”
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই কথাগুলো শুনলে মনে হতে পারে তিনি ফুটবল নয়, ভাগ্য আর বিশ্বাসের গল্প বলছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের এই ফাইনালকে ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তা যেন সত্যিই বাস্তবের চেয়েও অবিশ্বাস্য।
ছবিটা নিশ্চয়ই আপনি দেখেছেন। না দেখলেও আগামী কয়েক দিনে আরও বহুবার দেখবেন। একটি প্লাস্টিকের টবে ফেনার মধ্যে চার মাসের এক শিশুকে স্নান করাচ্ছেন ১৯ বছরের এক লাজুক তরুণ ফুটবলার। সেই তরুণ লিওনেল মেসি। আর শিশুটি? আজকের লামিনে ইয়ামাল।
রবিবার, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে, সেই দু’জনই মুখোমুখি।
একটি ছবির জন্ম
সময়টা ২০০৭ সালের বড়দিনের সময়। বার্সেলোনা ও ইউনিসেফ যৌথভাবে একটি চ্যারিটি ক্যালেন্ডার তৈরি করছিল। ক্যাম্প ন্যুর অতিথি ড্রেসিংরুমে অস্থায়ী স্টুডিও বানানো হয়েছিল। প্রত্যেক ফুটবলারের সঙ্গে একটি করে শিশুর ছবি তোলা হবে।
রোনালদিনহো ছিলেন জুলাই মাসের মুখ। জানুয়ারির জন্য ছিলেন মেসি।
চার মাসের লামিনে ইয়ামালের মা শেইলা লটারি জিতে ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন। আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ত আগের রাতে নিজের মেয়েকে স্নান করানোর সময় মাথায় আসা ধারণা থেকে একটি প্লাস্টিকের টব আর রাবারের হাঁস নিয়ে হাজির হন।
লাজুক মেসি, কোলের ছোট্ট শিশু আর মায়ের সহযোগিতায় তোলা হয় সেই ছবি।
তারপর?
সবাই ভুলে গেল।
হারিয়ে যাওয়া ছবির পুনর্জন্ম
ছবিটি হাজার হাজার ছবির মধ্যে হারিয়ে যায়। মনফোর্তও আর গুরুত্ব দেননি।
২০২৪ ইউরো চলাকালীন ইয়ামালের বাবা মুনির হঠাৎ সামাজিক মাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করেন। সঙ্গে লেখেন—“দুই কিংবদন্তির সূচনা।”
সেই মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে বিস্ময়।
কীভাবে সম্ভব?
লটারিতে বেছে নেওয়া একটি শিশু পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিভা হয়ে উঠল কীভাবে? আর সেই শিশুকে কোলে নেওয়া লাজুক কিশোরই পরে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠলেন!
মনফোর্ত পর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন—“যদি এটা আদৌ লামিনে না হয়?”
ইউনিসেফ পর্যন্ত পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে বাধ্য হয়, হ্যাঁ, ছবিটি সত্যিই আসল।
যেন ভাগ্যের লেখা চিত্রনাট্য
ছবিটি প্রকাশের চার দিনের মধ্যেই ইউরো সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত গোল করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন ইয়ামাল।
মনফোর্ত পরে বলেন, ঘটনাটা যেন সৃষ্টির গল্পের মতো।
ইয়ামালের বাবা অবশ্য মজা করে বলেছিলেন—“হয়তো উল্টোটা হয়েছে। মেসিকে জীবন দিয়েছিল লামিনেই।”
দ্বিতীয় সাক্ষাৎ
এরপর আরেকবার দেখা হয়েছিল।
বার্সেলোনার অনুশীলন কেন্দ্রে। তখন ইয়ামালের বয়স মাত্র ১১-১২। তিনি আর সাধারণ শিশু নন। লা মাসিয়ার প্রতিভাবান ছাত্র।
মেসি তখন ইতিমধ্যেই কিংবদন্তি।
মিল, অমিল এবং উত্তরাধিকার
দু’জনের জীবনেই অদ্ভুত মিল আছে।
মেসি ১২ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা ছেড়ে বার্সেলোনায় এসেছিলেন। ইয়ামালের বাবা মরক্কোর, মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির। কাতালোনিয়াতেই জন্ম তাঁর। গোল করার পর তিনি নিজের এলাকার পোস্টকোড ‘০৮৩০৪’ দেখিয়ে উদযাপন করেন—রোকাফোন্দার সেই দরিদ্র মহল্লাকে স্মরণ করে।
মেসি বেছে নিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। ইয়ামাল বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বেছে নিয়েছেন স্পেনকে।
মেসি নয়, নিজের পথ
ইয়ামাল বারবার বলেছেন, “মেসি ইতিহাসের সেরা।”
তবে তাঁর শৈশবের আদর্শ ছিলেন নেইমার।
নেইমারের আনন্দ, দুষ্টুমি, সৃজনশীলতাই তাঁকে বেশি টেনেছিল। মেসির প্রতি শ্রদ্ধা অগাধ হলেও, নিজের খেলার পরিচয় তিনি আলাদা রাখতে চান।
“আমি মেসির মতো খেলতে চাই না। আমি আমার নিজের পথেই হাঁটতে চাই।”
তবু তুলনা এড়ানো যায় না।
যে বাঁ পায়ের গোলটি ইয়ামাল বারবার করেন, সেটি অবিকল মনে করিয়ে দেয় তরুণ মেসিকে।
স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তের ভাষায়, “কিছু মানুষ আছে, যাদের ঈশ্বর নিজের জাদুর ছোঁয়া দেন। মেসি যেমন, ইয়ামালও তেমন।”
সংখ্যার আশ্চর্য মিল
বিশ্বকাপে প্রথম গোল—দু’জনেই করেছেন ১৯ নম্বর জার্সি পরে, ১৮ বছর বয়সে।
বার্সেলোনায় সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেক—ইয়ামাল ভেঙেছেন মেসির রেকর্ড।
মাত্র ১৯ বছরেই বার্সেলোনার হয়ে ১৫১ ম্যাচ খেলেছেন, তিনটি লিগ জিতেছেন।
মেসি সেই বয়সে খেলেছিলেন মাত্র ৩৪ ম্যাচ।
দুই যুগের সন্ধিক্ষণ
মেসির বয়স এখন ৩৯। এটি তাঁর ষষ্ঠ এবং সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ।
ইয়ামালের প্রথম।
একজন বিদায়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কিংবদন্তি, অন্যজন নতুন যুগের সম্ভাব্য মুখ।
মেসি নিজেই বলেছেন, “আমাকে যদি একজনকে বেছে নিতে হয়, আমি লামিনে ইয়ামালকেই বেছে নেব। নিঃসন্দেহে সে ভবিষ্যতের সেরা।”
ইয়ামালের উত্তরও সমান শ্রদ্ধার।
“মেসিই ইতিহাসের সেরা। মাঠে দেখা হলে পরস্পরের প্রতি সম্মানই থাকবে।”
২০০৭ সালে এক টবে শুরু হওয়া সেই অদ্ভুত সম্পর্কের গল্প ২০২৬ সালে এসে পৌঁছেছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি বনাম লামিনে ইয়ামাল।
একটি ছবির অলৌকিক পরিণতি—যার ব্যাখ্যা হয়তো যুক্তিতে নয়, বিশ্বাসেই খুঁজে পাওয়া যায়।