বাংলাস্ফিয়ার: ক্রিকেটের ইতিহাসে কিছু নাম পরিসংখ্যানের সীমা ছাড়িয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। তাঁদের নিয়ে আলোচনা হয় না শুধু কত রান করেছেন, কত উইকেট নিয়েছেন বা কত ম্যাচ জিতিয়েছেন, বরং তাঁরা একটি খেলার আত্মাকে কতটা সমৃদ্ধ করেছেন, তা নিয়েই কথা হয়। স্যার গারফিল্ড সেন্ট অউব্রান সোবার্স—বিশ্বের কাছে যিনি গ্যারি সোবার্স—ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন। তাঁর প্রয়াণে ক্রিকেট শুধু একজন মহান খেলোয়াড়কে হারাল না; হারাল এমন এক শিল্পীকে, যিনি ক্রিকেটকে এক অনন্য সৌন্দর্যের স্তরে উন্নীত করেছিলেন।

১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই বার্বাডোজে জন্ম। ক্যারিবিয়ানের রোদ, সমুদ্র আর স্বাধীনচেতা জীবনের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা। খুব অল্প বয়সেই বোঝা গিয়েছিল, এই ছেলেটির মধ্যে অসাধারণ কিছু আছে। কিন্তু তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, একদিন তাঁকেই সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার তো বটেই, অনেকের চোখে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

ডন ব্র্যাডম্যানকে ক্রিকেটের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান বলা হয়। তাঁর ব্যাটিং গড় আজও অলৌকিক। কিন্তু ক্রিকেট শুধু ব্যাটিংয়ের খেলা নয়। আর সেখানেই গ্যারি সোবার্স অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যান। তিনি ছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি একাই একটি দলের তিন-চারটি ভূমিকা পালন করতে পারতেন। ব্যাট হাতে তিনি ছিলেন বিধ্বংসী, বল হাতে পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে ফেলতেন নিজের চরিত্র। কখনও মিডিয়াম পেস, কখনও বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন, কখনও আবার রিস্ট স্পিন। আধুনিক ক্রিকেটে একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে এত বৈচিত্র্য কল্পনাও করা যায় না।

সোবার্সের ব্যাটিং ছিল যেন সংগীত। তাঁর কভার ড্রাইভে ছিল সৌন্দর্য, পুল শটে ছিল আত্মবিশ্বাস, আর ছক্কায় ছিল অবাধ স্বাধীনতার ঘোষণা। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিংস্টনে তাঁর ৩৬৫ রানের ইনিংস শুধু একটি রেকর্ড ছিল না, ছিল প্রতিভার বিস্ফোরণ। সেই রেকর্ড তিন দশকেরও বেশি সময় অটুট ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সেই কীর্তিও তাঁর পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি হয়ে ওঠেনি। কারণ তিনি প্রতি ম্যাচেই নতুন কিছু সৃষ্টি করতেন।

সংখ্যাগুলি অবশ্য তাঁর মহত্ত্বের সাক্ষ্য দেয়। ৯৩টি টেস্টে ৮,০৩২ রান, ব্যাটিং গড় ৫৭.৭৮, ২৬টি শতরান, ২৩৫টি উইকেট এবং ১০৯টি ক্যাচ। কিন্তু যাঁরা তাঁকে খেলতে দেখেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁর চলাফেরা, তাঁর স্বাভাবিকতা, তাঁর অনায়াস দক্ষতা। যেন ক্রিকেট তাঁর কাছে কোনও কঠিন পরীক্ষা নয়, এক আনন্দময় সৃজন।

১৯৬৮ সালে কাউন্টি ক্রিকেটে ম্যালকম ন্যাশকে এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মেরে তিনি যে কীর্তি গড়েছিলেন, তা আজও ক্রিকেট ইতিহাসের এক চিরসবুজ অধ্যায়। টি-টোয়েন্টির যুগে এমন দৃশ্য আমরা মাঝেমধ্যে দেখি। কিন্তু সেই সময়ে সেটি ছিল প্রায় অকল্পনীয়। সোবার্সের মধ্যে ছিল সেই বিরল সাহস, যা সময়কে ছাড়িয়ে যায়।

তাঁর ব্যক্তিত্বও ছিল অসাধারণ। তিনি ছিলেন প্রাণখোলা, হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী, মাঠের বাইরে বন্ধু। ক্রিকেট তখনও বাণিজ্যের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েনি। খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য ছিল খেলাটির অন্যতম সৌন্দর্য। সোবার্স সেই সংস্কৃতির অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন। ভারতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে তাঁর ব্যাটিং দেখতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাতেন। বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীর স্মৃতিতে তাঁর নাম আজও এক গভীর আবেগের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটীয় আত্মপরিচয় গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অপরিসীম। ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের মানবিক নেতৃত্ব, রোহন কানহাইয়ের শিল্পময় ব্যাটিং, কনরাড হান্টের দৃঢ়তা—এই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সোবার্স। পরে ক্লাইভ লয়েডের বিশ্বজয়ী দলের যে আত্মবিশ্বাস, তার বীজও রোপিত হয়েছিল সোবার্সদের প্রজন্মেই।

আজকের ক্রিকেটে বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান, বিশেষজ্ঞ বোলার, বিশেষজ্ঞ ফিনিশার, বিশেষজ্ঞ ফিল্ডারের যুগ। কিন্তু সোবার্স ছিলেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ক্রিকেটার। তাঁর পরেও বহু মহান অলরাউন্ডার এসেছেন—কাপিল দেব, ইমরান খান, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হ্যাডলি, জ্যাক ক্যালিস, বেন স্টোকস। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের তুলনার মাপকাঠি হয়ে থেকেছেন একজনই—গ্যারি সোবার্স।

একটি যুগের মূল্য বোঝা যায়, যখন সেই যুগের শেষ মানুষগুলিও একে একে বিদায় নেন। সোবার্সের প্রয়াণ সেই অনুভূতিকেই আরও গভীর করে দিল। আজকের ক্রিকেট প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত, বিপুল অর্থে আবর্তিত। কিন্তু সোবার্সের সময়ে ক্রিকেট ছিল শিল্প, কল্পনা, সাহস ও চরিত্রের এক অনুপম সমন্বয়। তিনি সেই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি।

মৃত্যু মানুষকে নিয়ে যায়, কিন্তু মহত্ত্বকে নয়। গ্যারি সোবার্স আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতিটি অলরাউন্ডারের মধ্যে, প্রতিটি নিখুঁত কভার ড্রাইভে, প্রতিটি অসম্ভব প্রত্যাবর্তনে, প্রতিটি নির্ভীক ক্রিকেটীয় কল্পনায় তিনি বেঁচে থাকবেন। ভবিষ্যতের ক্রিকেট তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারে পরিসংখ্যানে; কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্য, পূর্ণতা এবং বহুমাত্রিকতার প্রতীক হিসেবে স্যার গ্যারি সোবার্সের নাম চিরকাল অম্লান থাকবে।

ক্রিকেটের অভিধানে ‘সম্পূর্ণ ক্রিকেটার’ শব্দবন্ধটির পাশে যদি কোনও একটি নাম লেখা যায়, তবে তা নিঃসন্দেহে—স্যার গ্যারি সোবার্স