হাইলাইটস:

  • সাম্প্রতিক হামলার জেরে গুজরাতে ৩১টি এশীয় সিংহকে আটক করেছে বন দপ্তর।
  • এদের মধ্যে ৭টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মানুষখেকো’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
  • অধিকাংশ হামলা ঘটেছে গির ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায়, যেখানে মানুষের সঙ্গে সিংহের সংঘাত দ্রুত বাড়ছে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, সিংহের সংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসস্থলের বিস্তার এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি সংঘাতের অন্যতম কারণ।
  • (সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন)

বাংলাস্ফিয়ার: গুজরাতে এশীয় সিংহ সংরক্ষণের সাফল্যের পাশাপাশি এখন নতুন এক উদ্বেগ সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মানুষের উপর ধারাবাহিক হামলার পর রাজ্যের বন দপ্তর ৩১টি সিংহকে ধরে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এর মধ্যে আচরণগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৭টিকে ‘মানুষখেকো’ বা মানুষের উপর বারবার আক্রমণকারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের একটি এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে।

বন দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, সব সিংহ মানুষকে শিকার হিসেবে দেখে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ ও বন্যপ্রাণীর আকস্মিক মুখোমুখি হওয়া, শাবক রক্ষার প্রবৃত্তি অথবা খাদ্যের প্রতিযোগিতা থেকে হামলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু যেসব সিংহ বারবার মানুষের উপর আক্রমণ চালায় এবং মানুষের উপস্থিতিকে ভয় পায় না, তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিক তদন্তে এমন সাতটি সিংহের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণের প্রমাণ মিলেছে।

গির জাতীয় উদ্যান এবং তার বাইরে এখন এশীয় সিংহের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত কয়েক দশকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে সিংহের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে তারা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে কৃষিজমি, গ্রামাঞ্চল এবং উপকূলবর্তী এলাকায়ও বিচরণ করছে। ফলে মানুষের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শ আগের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে।

বন দপ্তর জানিয়েছে, হামলার প্রতিটি ঘটনার পরে ঘটনাস্থলের পায়ের ছাপ, ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবি, ডিএনএ নমুনা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সিংহকে শনাক্ত করা হয়েছে। এরপর বিশেষ দল গঠন করে ওই প্রাণীগুলিকে জীবিত অবস্থায় ধরে আনা হয়। বর্তমানে তাদের পৃথক আবদ্ধ পরিবেশে রেখে আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

যেসব সিংহকে মানুষখেকো হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের আর বনে ছেড়ে দেওয়া হবে না বলেই বন দপ্তরের সূত্রের দাবি। কারণ, তাদের পুনরায় মুক্ত পরিবেশে ছেড়ে দিলে মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে যেসব সিংহের বিরুদ্ধে এমন ধারাবাহিক আচরণের প্রমাণ মেলেনি, তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিচার করে পুনর্বাসন বা পুনরায় বনে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজরাতে সিংহ সংরক্ষণ একটি বড় সাফল্য হলেও তার নতুন চ্যালেঞ্জ হল মানুষ-সিংহ সংঘাত নিয়ন্ত্রণ। সিংহের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিচরণক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে। অনেক গ্রাম, চাষের জমি এবং পশুপালনের এলাকায় এখন নিয়মিত সিংহের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। রাতে গবাদি পশু শিকার করতে গিয়ে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও বেড়েছে।

বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সব হামলাকে মানুষখেকো প্রবণতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়। আহত সিংহ, বয়স্ক সিংহ অথবা শাবকসহ সিংহী অনেক সময় আত্মরক্ষার্থে আক্রমণ করতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনায় বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন দপ্তরও সেই কারণেই প্রতিটি হামলার পর বিস্তারিত আচরণগত বিশ্লেষণ করছে।

গুজরাত সরকার ইতিমধ্যেই সংঘাতপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন পর্যবেক্ষণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল এবং গ্রামবাসীদের সতর্ক করার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বনাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামগুলিতে রাতে একা বের না হওয়া, গবাদি পশুকে সুরক্ষিত ঘেরে রাখা এবং সিংহ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে বন দপ্তরকে খবর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এশীয় সিংহ বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক আবাস হিসেবে গুজরাটের গির অঞ্চল আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করে। সেই কারণেই সংরক্ষণ ও জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিপন্ন প্রজাতির সুরক্ষা, অন্যদিকে মানুষের প্রাণ ও জীবিকার নিরাপত্তা—দুই লক্ষ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, সিংহের সংখ্যা বৃদ্ধি যেমন সংরক্ষণের সাফল্যের প্রতীক, তেমনই সেই সাফল্যের ফলস্বরূপ তৈরি হওয়া মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত মোকাবিলায় ভবিষ্যতে আরও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা কতটা জরুরি। গুজরাতের অভিজ্ঞতা এখন দেশের অন্যান্য বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ প্রকল্পের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।