হাইলাইটস:

  • রাজ্যের পুরসভাগুলিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারী সরকার।
  • সরকারের দাবি, জনসংখ্যার পরিবর্তন ও প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বহুদিন ধরেই এই পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন ছিল।
  • বিজেপির বক্তব্য, সমসংখ্যক জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।
  • তৃণমূলের অভিযোগ, আসন্ন পুরভোটের আগে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যেই ওয়ার্ডের সীমানা বদলের চেষ্টা হচ্ছে।
  • নতুন সীমানা চূড়ান্ত হওয়ার পর একাধিক পুরসভার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভায় ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু করতে উদ্যোগী হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। প্রশাসনের বক্তব্য, গত এক দশকে বহু এলাকায় জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। কোথাও জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কোথাও আবার কমেছে। ফলে বহু ওয়ার্ডে ভোটারের সংখ্যা ও জনসংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। সেই অসামঞ্জস্য দূর করতেই ডিলিমিটেশন বা ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করা হচ্ছে।

সরকারি সূত্রের দাবি, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য প্রশাসনিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে তুলনামূলকভাবে সমসংখ্যক মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নতুন আবাসন, শহরের বিস্তার এবং নগরায়ণের ফলে গড়ে ওঠা নতুন এলাকাগুলিকেও যথাযথভাবে ওয়ার্ড কাঠামোর মধ্যে আনা হবে।

বিজেপির বক্তব্য, এটি কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। দলের নেতাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যার পরিবর্তন সত্ত্বেও বহু পুরসভায় পুরনো সীমানা বহাল ছিল। ফলে কোথাও একটি ওয়ার্ডে অত্যধিক জনসংখ্যা, আবার কোথাও তুলনামূলকভাবে অনেক কম মানুষ বসবাস করছেন। এই বৈষম্য দূর না করলে সমান প্রতিনিধিত্বের নীতি ক্ষুণ্ণ হয়।

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। দলের অভিযোগ, আসন্ন পুরভোটের আগে রাজনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যেই সরকার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে। বিরোধীদের দাবি, যেসব এলাকায় বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী, সেগুলিকে সুবিধাজনকভাবে পুনর্গঠন করার চেষ্টা হতে পারে। এতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ওয়ার্ডের সীমানা সামান্য পরিবর্তিত হলেও ভোটারদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিন্যাস বদলে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কোনও একটি দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ওয়ার্ডের ফলাফলও পরিবর্তিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিলিমিটেশন কার্যকর করতে হলে সর্বশেষ জনসংখ্যার তথ্য, নগর বিস্তার, ভৌগোলিক সংযোগ এবং প্রশাসনিক সুবিধার বিষয়গুলি বিবেচনা করা জরুরি। পাশাপাশি খসড়া প্রকাশ, আপত্তি জানানোর সুযোগ এবং স্বচ্ছ পদ্ধতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাজ্যে পুরভোটের আগে এই উদ্যোগ রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পুরসভা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের ফলে কোথাও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে কি না, তা এখন রাজনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

প্রশাসনের দাবি, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং জনস্বার্থে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক যুক্তির আড়ালে রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা চলছে। ফলে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ক্রমশ রাজ্যের পুর রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। আগামী পুরভোটের আগে এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত মানচিত্রই নির্ধারণ করবে বিতর্ক কত দূর গড়ায় এবং রাজনৈতিক সমীকরণে তার কতটা প্রভাব পড়ে।