হাইলাইটস:

  • অনশনের ২০তম দিনে সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন আরএমএল ও সফদরজং হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।
  • শিক্ষা সংস্কার, পরীক্ষায় অনিয়মের জবাবদিহি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে চলছে তাঁর অনশন।
  • শারীরিক অবস্থা অবনতির আশঙ্কা থাকলেও ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ওয়াংচুক।
  • দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
  • দেশজুড়ে ছাত্র-যুবদের শান্তিপূর্ণভাবে সংসদ অভিযানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষাবিদ।

বাংলাস্ফিয়ার: শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে অনশনে বসা শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন শনিবার নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর অনশন ২০ দিনে পড়তেই শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) এবং সফদরজং হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল শনিবার তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে যাচ্ছে।

গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন ওয়াংচুক। তাঁর অভিযোগ, দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় একের পর এক প্রশ্নফাঁস, মূল্যায়নে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরও কেন্দ্রীয় সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই কারণেই তিনি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার নয়, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও দাবি করছেন।

অনশনের ২০তম দিনে সমর্থকদের উদ্দেশে ওয়াংচুক বলেন, তিনি যে কোনও মূল্যে ২০ জুলাই পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চান। কারণ, ওই দিন সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে “চলো সংসদ” কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি ২০ জুলাই পর্যন্ত বেঁচে থাকব। আপনাদের সঙ্গে সংসদ পর্যন্ত হাঁটব।” একই সঙ্গে রসিকতার সুরে মন্তব্য করেন, যদি আন্দোলন সফল না হয়, তবে “ভূত হয়ে আবার ফিরে আসব।”

ওয়াংচুকের এই মন্তব্যের মধ্যেও তাঁর দৃঢ়তা স্পষ্ট হলেও চিকিৎসকেরা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর বলেই মনে করছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় শুধুমাত্র নুন মেশানো জল খেয়ে থাকার ফলে তাঁর ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এভাবে অনশন চলতে থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ওয়াংচুকের শারীরিক অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দিল্লি হাইকোর্টও সম্প্রতি হস্তক্ষেপ করেছে। আদালত প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে, তাঁর স্বাস্থ্যের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে অবিলম্বে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই নির্দেশের পরই আরএমএল ও সফদরজং হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়ে বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

যদিও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তবু অনশন ভাঙার কোনও ইঙ্গিত দেননি ওয়াংচুক। বরং তিনি সমর্থকদের অনুরোধ করেছেন, তাঁকে অনশন ছাড়ার অনুরোধ না করে ২০ জুলাইয়ের সংসদ অভিযানে যোগ দিতে। তাঁর মতে, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ নাগরিকদের একজোট হতে হবে।

ওয়াংচুকের আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা। তাঁর অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। শুধু প্রশ্নফাঁস নয়, মূল্যায়নের স্বচ্ছতা, পরীক্ষা পরিচালনার জবাবদিহি এবং পরীক্ষা সংস্থাগুলির সংস্কারের দাবিও তিনি তুলেছেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন একটি সামগ্রিক শিক্ষা সংস্কার কর্মসূচি।

এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে ব্যঙ্গাত্মক নাগরিক মঞ্চও ২০ জুলাই সংসদ অভিযানের ডাক দিয়েছে। তাদের দাবি, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। তাই সংসদের সামনে গিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে সরাসরি দাবি তুলে ধরাই আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ।

ওয়াংচুক দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরও এই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পাঠ্যবইয়ের বাইরে গণতন্ত্রের বাস্তব পাঠ শেখার এ এক বিরল সুযোগ। শান্তিপূর্ণ, অহিংস এবং সাংবিধানিক উপায়ে কীভাবে নাগরিকরা নিজেদের দাবি তুলে ধরতে পারেন, তা প্রত্যক্ষ করার জন্যই তিনি তরুণ প্রজন্মকে সংসদ অভিযানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানালেও ওয়াংচুকের বক্তব্য, সরকারের কাছ থেকে কোনও ইতিবাচক বার্তা না পেলে এখন অনশন ভাঙা আন্দোলনের উদ্দেশ্যকেই দুর্বল করে দেবে।

আজ চিকিৎসকদের পরীক্ষার ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁরা যদি মনে করেন অনশন অব্যাহত থাকলে প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তবে আরও কড়া চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরামর্শ মেনে চলবেন কি না, তা নির্ভর করবে ওয়াংচুকের সিদ্ধান্তের উপর।

সোমবারের সংসদ অভিযানকে ঘিরে এখন রাজধানীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতাও বাড়ছে। একদিকে আন্দোলনকারীরা বড় সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়েও সতর্ক প্রশাসন। এই অবস্থায় শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ওয়াংচুকের অনশন আগামী কয়েক দিনে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

(এই প্রতিবেদনের পরিমার্জন হবে)