হাইলাইটস:

  • পুরীর জগন্নাথ রথযাত্রায় ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ২ ভক্তের মৃত্যু।
  • আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ, অনেকের অবস্থা গুরুতর।
  • পাহান্ডি শোভাযাত্রা শেষ হওয়ার পর মারিচিকোট চকের কাছে হুড়োহুড়ি শুরু হয়।
  • লক্ষ লক্ষ ভক্তের ঢল সামলাতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন।

বাংলাস্ফিয়ার: পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুধু ওডিশার নয়, সমগ্র ভারতের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই উৎসবে অংশ নিতে পুরীতে ভিড় করেন। কিন্তু এবারের রথযাত্রা আনন্দ ও ভক্তির আবহের পাশাপাশি নিয়ে এল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বৃহস্পতিবার ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত দুই ভক্তের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় গোটা দেশ শোকাহত। একই সঙ্গে এত বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাটি ঘটে রথযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ‘পাহান্ডি’ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে। পাহান্ডি হল সেই ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা, যেখানে শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার বিগ্রহ মন্দির থেকে বের করে রথে তোলা হয়। এই সময় হাজার হাজার ভক্ত দেবদর্শনের জন্য একসঙ্গে সামনে এগিয়ে আসেন।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, মারিচিকোট চকের কাছে, যা পুরী জেলা সদর হাসপাতালের খুব কাছেই অবস্থিত, আচমকা ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। একদল ভক্ত সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্যদিক থেকে চাপ বাড়তে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষ ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। এরপর তাঁদের উপর দিয়েই আরও মানুষ চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেকে চিৎকার করতে থাকেন, কেউ পড়ে যান, কেউ আবার নিজেদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে না পেয়ে আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করেন। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই বহু মানুষ আহত হন।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন। আহতদের উদ্ধার করে সঙ্গে সঙ্গে পুরী জেলা সদর হাসপাতাল এবং আশপাশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, আহতদের মধ্যে অনেকের মাথা, বুক এবং হাত-পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেও জানা গেছে।

পুলিশ প্রথমে একজনের মৃত্যুর কথা জানালেও পরে চিকিৎসকরা আরও একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই। প্রশাসন আশঙ্কা করছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তেও পারে।

রথযাত্রা উপলক্ষে এ বছর কয়েক লক্ষ নয়, কয়েক মিলিয়ন ভক্ত পুরীতে এসেছেন বলে প্রশাসনের অনুমান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও বিদেশ থেকেও বহু দর্শনার্থী এই উৎসব দেখতে আসেন। এত বিপুল জনসমাগম সামলাতে পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবস্থা করা হলেও বাস্তবে ভিড়ের চাপ অনেক বেশি হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় উৎসবে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা সাধারণত কয়েকটি কারণে ঘটে—একসঙ্গে অতিরিক্ত মানুষ একটি সংকীর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়া, হঠাৎ সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা, গুজব বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া এবং পর্যাপ্ত জনস্রোত নিয়ন্ত্রণের অভাব। পুরীর ঘটনাতেও সেই একই চিত্র দেখা গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রথযাত্রার সময় গ্র্যান্ড রোড বা বড়দাণ্ডের দু’পাশে অসংখ্য ভক্ত দাঁড়িয়ে থাকেন। দেবদর্শনের জন্য সামনের দিকে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ থাকে। এই আবেগই অনেক সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে পাহান্ডি শেষ হওয়ার পরে রথের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করতেই চাপ বাড়ে।

ঘটনার পরে প্রশাসন দ্রুত অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। কিছু সময়ের জন্য ভক্তদের চলাচলও নিয়ন্ত্রিত করা হয় যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়। মাইকিং করে মানুষকে শান্ত থাকার এবং ধাক্কাধাক্কি না করার আবেদন জানানো হয়।

এই দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বহু ভক্ত এবং বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, এত বড় আন্তর্জাতিক মানের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, ভিড়ের গতিবিধি বিশ্লেষণ, প্রবেশ ও প্রস্থানের পৃথক পথ, বাস্তবসময়ের নজরদারি এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

পুরীর রথযাত্রা ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক। সেই উৎসবেই প্রাণহানির এই ঘটনা ভক্তদের মনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। এখন সকলের নজর প্রশাসনের তদন্তের দিকে। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।