Table of Contents
হাইলাইটস:
- বিদেশি পর্যটকের ঢলে ঐতিহ্যবাহী রিয়োকানেও ঢুকছে বিলাসবহুল ও পাশ্চাত্য পরিষেবা।
- ২০২৫ সালে জাপানে এসেছেন প্রায় ৪ কোটি ২০ লক্ষ বিদেশি পর্যটক, তাঁদের ৬৮ শতাংশই রিয়োকানে থাকার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
- বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আধুনিকতার দৌড়ে জাপানের শতাব্দীপ্রাচীন আতিথেয়তার দর্শন ‘ওমোতেনাশি’ কি হারিয়ে যাবে?
জাপানের ঐতিহ্যবাহী রিয়োকান শুধু একটি সরাইখানা নয়—এটি দেশটির সংস্কৃতি, আতিথেয়তা এবং জীবনদর্শনের এক জীবন্ত প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাতামি বিছানো ঘর, অনসেনের উষ্ণ জলে স্নান, ইউকাতা পরে থাকা এবং নিখুঁত আতিথেয়তার মধ্য দিয়ে অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে ‘আসল জাপান’-এর অভিজ্ঞতা।
কিন্তু এখন সেই রিয়োকানই বদলে যাচ্ছে।
বিদেশি পর্যটকের নজিরবিহীন ভিড়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঐতিহ্যের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে পাঁচতারা বিলাসিতা, ব্যক্তিগত স্পা, ওয়েলনেস পরিষেবা, পাশ্চাত্য ধাঁচের বার ও রেস্তোরাঁ। আর তাতেই উঠছে বড় প্রশ্ন—জাপানের বহু শতাব্দী পুরনো ‘ওমোতেনাশি’ কি ধীরে ধীরে শুধুই একটি বিপণন শব্দে পরিণত হচ্ছে?
পর্যটকের চাহিদায় বদলে যাচ্ছে রিয়োকান
মাউন্ট ফুজির পাদদেশে শিজুওকা প্রদেশের সুবাশিরিতে ২০২৫ সালে চালু হয়েছে বিলাসবহুল গোরা কাদান ফুজি। এখানে শুধু থাকার ব্যবস্থা নয়, অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে হাতে ধান কাটার অভিজ্ঞতা, মাউন্ট ফুজিতে ট্রেকিং এবং ফুজিনোমিয়ার ঐতিহাসিক শিন্তো মন্দির ভ্রমণের মতো বিশেষ আয়োজন।
লক্ষ্য একটাই—বিদেশি পর্যটকদের সামনে ‘আসল জাপান’-এর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা।
শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের গল্প
রিয়োকানের ইতিহাস শুরু এদো যুগে (১৬০৩–১৮৬৮)। সেই সময় প্রধান সড়কের ধারে গড়ে ওঠা ‘হাতাগো’ সরাইখানাগুলিই পরে রিয়োকানে রূপ নেয়।
রিয়োকানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে—
- তাতামি বিছানো কক্ষ
- প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ বা অনসেন
- ইউকাতা পরে থাকার অভিজ্ঞতা
- নির্দিষ্ট সময়ে পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী জাপানি খাবার
- অতিথিকে আন্তরিকভাবে সেবা করার দর্শন ‘ওমোতেনাশি’
এই দর্শনের মূল কথা, অতিথির প্রয়োজন আগেভাগেই বুঝে নিঃস্বার্থভাবে সেবা করা।
বিদেশি পর্যটকই এখন বড় ভরসা
জাপানের পর্যটন শিল্পে এখন বিদেশিদের গুরুত্ব আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি।
২০২৫ সালে দেশটিতে প্রায় ৪ কোটি ২০ লক্ষ বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন। জাপান পর্যটন সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ অন্তত একবার রিয়োকানে থাকার অভিজ্ঞতা নিতে চেয়েছিলেন।
দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদেশি অতিথিরাই এখন রিয়োকান শিল্পের প্রধান ভরসা।
ঐতিহ্য বনাম আরামের সমীকরণ
অনেক বিদেশি পর্যটক অনসেনে স্নান, তাতামির ঘরে থাকা কিংবা ইউকাতা পরে ঘোরার অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে চান। তবে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পরিবেশন, কঠোর নিয়মকানুন বা সম্পূর্ণ জাপানি জীবনধারার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেকের কাছেই সহজ নয়।
সেই কারণেই বিশেষ করে বিলাসবহুল রিয়োকানগুলো নিজেদের বদলে ফেলছে।
রাতপ্রতি দুই লক্ষ ইয়েনেরও বেশি ভাড়ার আবাসগুলিতে এখন যুক্ত হচ্ছে—
- পাশ্চাত্য ধাঁচের বার
- আধুনিক রেস্তোরাঁ
- ব্যক্তিগত স্পা
- ম্যাসাজ ও ওয়েলনেস পরিষেবা
- আন্তর্জাতিক মানের বিলাসবহুল সুবিধা
পাঁচতারা হোটেল আর রিয়োকানের মেলবন্ধন
এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ ফুফু টোকিও গিনজা, যা ২০২৫ সালের শেষ দিকে টোকিওর অভিজাত গিনজা এলাকায় চালু হয়েছে।
৩৪টি কক্ষের এই রিয়োকানে প্রতিটি ঘরে রয়েছে প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণের জল এবং উচ্চমানের জাপানি রেস্তোরাঁ। অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাহী রিয়োকানের আবহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঁচতারা হোটেলের আরাম।
রাজপরিবার থেকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড
গোরা কাদানের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়।
১৯৩০ সালে রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স কান’ইন কোটোহিতোর জন্য নির্মিত একটি ভিলাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর পুত্র রিয়োকানে রূপান্তর করেন। ফ্রান্সে দীর্ঘদিন থাকার অভিজ্ঞতার প্রভাবেই তিনি জাপানি ঐতিহ্যের সঙ্গে কিছু পাশ্চাত্য বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেন।
আশির দশকে আধুনিকীকরণের পর গোরা কাদান আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল আতিথেয়তা নেটওয়ার্ক Relais & Châteaux-এর সদস্য হয়। ১৯৯৪ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাক শিরাকও সেখানে অবকাশযাপন করেছিলেন।
বিদেশি বিনিয়োগ, নতুন প্রশ্ন
শুধু পর্যটক নয়, বিদেশি বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে এই খাতে। ২০২৩ সালে মার্কিন সংস্থা স্টার এশিয়া গোরা কাদান গোষ্ঠীকে অধিগ্রহণ করে।
এর ফলে রিয়োকান শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক প্রসারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বিতর্কও জোরালো হচ্ছে—বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের মন জয় করতে গিয়ে জাপানের শতাব্দীপ্রাচীন আতিথেয়তার দর্শন ‘ওমোতেনাশি’ কি ধীরে ধীরে তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের রিয়োকান সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।