হাইলাইটস:
- মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স
- অষ্টম গোল করে নেতৃত্বের ভূমিকাও আরও দৃঢ় করেছেন কিলিয়ান এমবাপে
- একসময় অধিনায়ক না হওয়ায় হতাশ হয়েছিলেন আঁতোয়ান গ্রিজম্যান, এখন আর বিতর্ক নেই
- তরুণ ফুটবলারদের বিশ্বকাপের গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন এমবাপে
- নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মকে চাপ সামলানোর পাঠ দিচ্ছেন ফরাসি অধিনায়ক
মরক্কোর বিরুদ্ধে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন আঁতোয়ান গ্রিজম্যান। কিন্তু এবার একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ফ্রান্স যখন আবারও জয় তুলে নিয়ে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাল, তখন গ্রিজম্যান মাঠে নন, গ্যালারিতে বসে সেই দৃশ্য দেখছিলেন।
সম্প্রতি মার্কিন ক্লাব অরল্যান্ডো সিটিতে যোগ দেওয়া ৩৫ বছর বয়সি গ্রিজম্যান ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর এই প্রথম ফ্রান্সের কোনও ম্যাচে উপস্থিত হলেন। একসময় তিনি ছিলেন দলের সহ-অধিনায়ক এবং কোচ দিদিয়ের দেশঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সৈনিকদের একজন।
২০২২ বিশ্বকাপের পর দীর্ঘদিনের অধিনায়ক উগো লরিস অবসর নিলে অধিকাংশের ধারণা ছিল, অধিনায়কের আর্মব্যান্ড এবার গ্রিজম্যানের হাতেই যাবে। প্রায় এক দশক ধরে দেশের হয়ে অসাধারণ ধারাবাহিকতা, দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্বের জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে স্বাভাবিক পছন্দ।
কিন্তু দেশঁ ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব তুলে দেন তখন মাত্র ২৪ বছর বয়সি কিলিয়ান এমবাপের হাতে। সেই সিদ্ধান্ত ফরাসি ফুটবলে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, এতদিনের বিশ্বস্ত গ্রিজম্যানকে বঞ্চিত করা ঠিক হয়নি।
পরে গ্রিজম্যান নিজেও স্বীকার করেছিলেন, এত বছরের নিষ্ঠার পর অধিনায়কত্ব না পাওয়া তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টের ছিল। সেই হতাশা গোপন করা সহজ ছিল না।
তবে তিন বছর পরে সেই বিতর্ক কার্যত অতীত। মরক্কোর বিরুদ্ধে ২-০ গোলের জয়ে এমবাপে নিজের অষ্টম গোল করে আবারও দলকে সেমিফাইনালে তুলেছেন। শুধু গোলদাতা হিসেবেই নয়, দলের সর্বাত্মক নেতা হিসেবেও তিনি এখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমবাপে এখন ফ্রান্সের মুখ, ভরসা এবং নেতৃত্বের প্রতীক। মাঠে গোল করছেন, সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করছেন, আবার দলের মানসিক ভারসাম্যও ধরে রাখছেন।
এবারের বিশ্বকাপে এমবাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে তাঁর অভিজ্ঞতা। বর্তমান ফরাসি দলে এমন ফুটবলার খুব কমই আছেন, যাঁরা আগের দুই বিশ্বকাপ খেলেছেন। এমবাপে এবং উসমান দেম্বেলে—এই দু’জনই সেই বিরল তালিকায় রয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০১৮ সালের বিশ্বজয়ী দলের সদস্য এন’গোলো কান্তে এবং লুকা এরনান্দেজ এবার কাতারে অনুষ্ঠিত আগের বিশ্বকাপে চোটের কারণে খেলতে পারেননি। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক ফুটবলারের কাছে এমবাপেই হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতার উৎস।
এই বিশ্বকাপে বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলন এবং সাক্ষাৎকারে এমবাপে বারবার একটি বিষয় তুলে ধরেছেন—তিনি এখন আর শুধু প্রতিভাবান তরুণ নন, বরং দুই বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞ একজন সিনিয়র ফুটবলার।
মরক্কোর বিরুদ্ধে জয়ের পর তিনি বলেন, “আমি বিশ্বচ্যাম্পিয়নও হয়েছি, আবার রানার্স-আপও হয়েছি। কিন্তু এই দল এখনও তার কোনওটাই নয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই মুহূর্তে এটাকে আমি আমার খেলা সেরা ফরাসি দল বলব না। তবে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দল। ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর জন্য এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত দল। আমরা এই দল নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেরা দল সেই, যে ট্রফি জেতে।”
এই সংযত মূল্যায়নের পেছনে রয়েছে তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা। ২০২০ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের আগে ফ্রান্সের আক্রমণভাগে ছিলেন এমবাপে, গ্রিজম্যান এবং করিম বেনজেমা। সেই সময় ফরাসি সংবাদমাধ্যম লিখেছিল, এমন আক্রমণভাগের জন্য বিশ্বের সব দেশই ঈর্ষা করবে।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেও সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ফ্রান্সকে।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এমবাপে এখন সতর্ক। তাঁর কথায়, “আমরা জানি এই দলের কতটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না।”

তিনি বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামি। কিন্তু আমাদের এখনও নিজেদের প্রমাণ করতে হবে। তার আগে কেউ যদি আমাদের অপরাজেয় বা অন্য কোনও বিশেষ অভিধায় ভূষিত করতে চায়, তার কোনও মূল্য নেই।”
ক্লাব ফুটবলে প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ ছাড়ার ঘটনাকে ঘিরে এমবাপের ভাবমূর্তি নিয়ে ফ্রান্সে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপালেই সেই বিতর্ক যেন মিলিয়ে যায়।
ফ্রান্সের হয়ে তাঁর প্রতি সমর্থন আজও অটুট। কারণ তিনি শুধু গোল করেন না, কঠিন সময়ে দলকে পথও দেখান।
প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দেওয়ার সহজাত ক্ষমতা, মিডিয়ার তীব্র আলোচনার মধ্যে নিজেকে স্থির রাখা এবং একই সঙ্গে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে এমবাপে প্রমাণ করেছেন, তিন বছর আগে দেশঁ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটি কতটা দূরদর্শী ছিল।
এখন তিনি দলের নবীন ফুটবলারদের অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করছেন।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চের গুরুত্ব বোঝানো তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। এমবাপে বলেন, “একজন ফুটবলারের কাছে বিশ্বকাপের চেয়ে বড় কিছু নেই। আমরা সেটা জানি এবং নতুনদেরও সেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি।”
এই কথার ওজনও কম নয়। কারণ বিশ্বকাপে মাত্র ২০টি ম্যাচ খেলেই এমবাপে ইতিমধ্যে ২০টি গোল করেছেন। এমন পরিসংখ্যান তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ ফুটবলারদের কাতারে নিয়ে গেছে।
তাই যখন তিনি নতুনদের বলেন, বিশ্বকাপের চাপকে সম্মান করতে হবে, তখন সেই কথার পেছনে রয়েছে নিজের অর্জনের শক্ত ভিত্তি।
এমবাপে আরও বলেন, “বিশ্বকাপে এই দেশের এক অসাধারণ ইতিহাস রয়েছে। নতুনদের সেটা জানতে হবে। একই সঙ্গে বুঝতে হবে, ফ্রান্সের হয়ে খেললে কতটা চাপ বহন করতে হয়।”
এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স শুরু থেকেই অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল। টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, তাদের দাবিও তত শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু সেই বাড়তি প্রত্যাশার চাপ দলকে ভেঙে দিতে পারেনি।
এখানেই অধিনায়ক হিসেবে এমবাপের সাফল্য স্পষ্ট। তিনি জানেন, বড় টুর্নামেন্টে প্রতিভার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন সামনে সেমিফাইনাল। ডালাসে আরও কঠিন পরীক্ষার অপেক্ষায় ফ্রান্স। এমবাপের লক্ষ্য একটাই—তাঁর তরুণ সতীর্থরা যেন উত্তেজনা বা অহংকারে ভেসে না যান।
কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, এই দল এখনও তার গন্তব্যে পৌঁছায়নি। সম্ভাবনা রয়েছে, প্রতিভা রয়েছে, ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করতে হলে শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিততেই হবে।
একসময় যে অধিনায়কত্ব নিয়ে বিতর্ক ছিল, আজ সেই এমবাপেই ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ভরসা। গোলদাতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এবার তিনি প্রমাণ করছেন, প্রকৃত নেতা শুধু ম্যাচ জেতান না—তিনি একটি প্রজন্মকে পথও দেখান।