Table of Contents
হাইলাইটস:
- ই২০ (২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল) কর্মসূচি স্থায়ী, বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ই১০ ফেরানোর পরিকল্পনা নেই।
- ব্রাজিলের তুলনায় দ্রুত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা—ভারত আগের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির সুবিধা পেয়েছে।
- ই২০, ই১০ ও বিশুদ্ধ পেট্রোল—তিন ধরনের জ্বালানি একসঙ্গে বাজারে রাখা বাস্তবসম্মত নয় বলে দাবি।
- ই২০ সস্তা নয় কেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকার।
- পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন, রাবারের যন্ত্রাংশ ও নির্মাতাদের সতর্কবার্তা নিয়ে উদ্বেগের জবাব দিয়েছে কেন্দ্র।
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোলের কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক যত বাড়ছে, কেন্দ্র ততই স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে—ই২০ এখন আর পরীক্ষামূলক প্রকল্প নয়, এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির অংশ। তাই বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ই১০-কে বিকল্প হিসেবে রেখে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা সরকারের নেই।
সরকারের বক্তব্য, ই২০ কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসার প্রশ্নই ওঠে না। বরং আগামী দিনে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এই নীতিই অনুসরণ করা হবে।
সম্প্রতি এই কর্মসূচি নিয়ে চারটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকার তার বিস্তারিত জবাব দিয়েছে।
ব্রাজিল যেখানে কয়েক দশক নিয়েছে, ভারত এত তাড়াহুড়ো করল কেন?
সমালোচকদের অন্যতম অভিযোগ, ব্রাজিলে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছতে কয়েক দশক সময় লেগেছে। ভারত মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ই২০ চালু করে ফেলেছে।
সরকারের যুক্তি, এই তুলনা বাস্তবসম্মত নয়।
ব্রাজিলকে সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি, নীতি ও অবকাঠামো তৈরি করতে হয়েছিল। ভারত যখন কর্মসূচি শুরু করেছে, তখন বিশ্বজুড়ে বহু বছরের অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করেই ভারত এগিয়েছে।
এ ছাড়া ভারত ধাপে ধাপে ইথানলের মাত্রা বাড়িয়েছে। প্রথমে ই৫, পরে ই১০ এবং এখন ই২০। ফলে হঠাৎ কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।
সরকারের দাবি, পরিকল্পনার তুলনায় ভারত অনেক আগেই ই২০ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে, যা দেশের জ্বালানি নীতির বড় সাফল্য।
কেন বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ই১০ কেনার সুযোগ থাকবে না?
এটাই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অনেকেই জানতে চাইছেন, যদি কোনও গাড়ির মালিক ই২০ ব্যবহার করতে না চান, তাহলে তিনি কেন বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ই১০ কিনতে পারবেন না?
সরকারের বক্তব্য, একই সময়ে তিন ধরনের জ্বালানি সরবরাহ করা অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল।
দেশজুড়ে প্রায় এক লক্ষেরও বেশি পেট্রোল পাম্পে আলাদা আলাদা সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন, পরিবহণ ব্যবস্থা ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
শুধু তাই নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাও জটিল হয়ে পড়বে। কোথায় কতটা ই২০, কোথায় কতটা ই১০ এবং কোথায় বিশুদ্ধ পেট্রোল পাঠাতে হবে, তা পরিচালনা করা কঠিন হবে।
সরকারের মতে, এত বড় ব্যবস্থার অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।
তাই একটি অভিন্ন জ্বালানি ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকর।
ই২০ যদি পরিবেশবান্ধব হয়, তাহলে দাম কম নয় কেন?
আরেকটি বড় প্রশ্ন, ই২০-তে যেহেতু পেট্রোলের পরিবর্তে দেশীয় ইথানল ব্যবহার হচ্ছে, তাহলে এর দাম কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
সরকার জানিয়েছে, খুচরা জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে শুধু কাঁচামালের দামই বিবেচ্য নয়।
ইথানল সংগ্রহ, পরিবহণ, মিশ্রণ, সংরক্ষণ, গুণমান নিয়ন্ত্রণ এবং বিতরণেরও আলাদা ব্যয় রয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম, কর কাঠামো এবং বিপণন সংস্থাগুলির ব্যয়ও চূড়ান্ত দামে প্রভাব ফেলে।
সরকারের বক্তব্য, ই২০-এর প্রধান লক্ষ্য ভোক্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সস্তা জ্বালানি দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা, কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা এবং নির্গমন কমানো।
পুরনো গাড়ির ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ কি অমূলক?
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে এখানেই।
বহু বিশেষজ্ঞের মতে, ই২০-তে ইথানলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পুরনো গাড়ির রাবারের পাইপ, সিল, গ্যাসকেটসহ কিছু যন্ত্রাংশ দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। অনেক পুরনো ইঞ্জিনে কর্মক্ষমতাও কমতে পারে।
এমনকি কিছু গাড়ি নির্মাতা আগেই জানিয়েছিলেন, পুরনো মডেলের গাড়িতে ই২০ ব্যবহারের আগে ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকা উচিত।
সরকার অবশ্য বলছে, এই উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।
তাদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের ওপর বিস্তৃত পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সেই পরীক্ষার ভিত্তিতেই ই২০ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের ই২০-উপযোগী গাড়িতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
তবে পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে নির্মাতার নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির কিছু রাবার বা প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করলে ই২০ ব্যবহার করা সম্ভব।
কেন ইথানলের উপর এত জোর?
সরকারের মতে, এর পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ রয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। আমদানি কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
অন্যদিকে আখ, ভুট্টা, ভাঙা চালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য থেকে ইথানল উৎপাদন হওয়ায় কৃষকরাও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পাবেন।
ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারে কার্বন মনোক্সাইড ও কিছু দূষণকারী গ্যাসের নির্গমনও কমতে পারে বলে সরকারের দাবি।
সমালোচকদের আপত্তি
তবে সমালোচকরা বলছেন, নীতির উদ্দেশ্য ভালো হলেও বাস্তবায়নে আরও নমনীয় হওয়া উচিত ছিল।
তাদের মতে, পুরনো গাড়ির মালিকদের জন্য অন্তত কিছু সময় বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ই১০ বিকল্প হিসেবে রাখা যেত।
এ ছাড়া ভোক্তাদের সামনে স্পষ্ট তথ্যও তুলে ধরা দরকার—কোন গাড়ি ই২০-উপযোগী, কোনটি নয় এবং প্রয়োজনে কী ধরনের পরিবর্তন করতে হবে।
সামনে কী?
কেন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট—ই২০ কর্মসূচি আর সাময়িক নয়, এটি ভারতের জ্বালানি নীতির স্থায়ী অংশ। তাই বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ই১০-এ ফিরে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।
তবে এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—পুরনো যানবাহনের ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন, গাড়ি নির্মাতাদের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং ভোক্তাদের কাছে স্বচ্ছ তথ্য পৌঁছে দেওয়ার উপর।
একদিকে জ্বালানি আমদানি কমানো ও পরিবেশগত সুবিধার লক্ষ্য, অন্যদিকে কোটি কোটি পুরনো গাড়ির বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।