হাইলাইটস
- টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে কলম্বিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড।
- নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট—মোট ১২০ মিনিটেও গোলশূন্য ম্যাচ।
- সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের একাধিক অসাধারণ সেভ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
- জেমস রদ্রিগেসদের একের পর এক সুযোগ নষ্টের খেসারত দিতে হয় কলম্বিয়াকে।
- ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল সুইজারল্যান্ড।
- শেষ আটে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে সুইসরা।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অনেক সময় ফুটবল কৌশলের লড়াইয়ে পরিণত হয়। গোলের ঝড় নয়, বরং ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষাই হয়ে ওঠে আসল বিষয়। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেসে কলম্বিয়া ও সুইজারল্যান্ডের শেষ ষোলোর লড়াই ছিল ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে টানটান উত্তেজনা, কিন্তু গোলের দেখা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের নির্মম বাস্তবতায় ৪-৩ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় সুইজারল্যান্ড।
ম্যাচ শেষে কলম্বিয়ার ফুটবলারদের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট ছিল। ডিফেন্ডার ডেভিনসন সানচেস আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কুচো হার্নান্দেস ধীরে ধীরে সতীর্থদের দিকে ফিরছিলেন। অন্যদিকে সুইস ফুটবলাররা উল্লাসে মেতে ওঠেন। চারদিকে হাজার হাজার হলুদ জার্সিধারী কলম্বিয়া সমর্থকের মাঝখানে লাল জার্সির ছোট্ট একটি দল ইতিহাস রচনা করে ফেলে।
১৯৫৪ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম শেষ আটে পৌঁছল সুইজারল্যান্ড। তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, যার নেতৃত্বে রয়েছেন লিওনেল মেসি।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, দুই দলই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। মাঝমাঠে বল দখলের লড়াই চললেও কোনও দলই দীর্ঘ সময় আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। কখনও ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়ে উঠেছে, আবার কখনও লম্বা বলের মাধ্যমে রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। পুরো ম্যাচটাই যেন দাবার চালের মতো হিসেব কষে এগিয়েছে।
সুইজারল্যান্ড বড় ধাক্কা খেয়েছিল ম্যাচের আগেই। দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আবিষ্কার জোহান মানজাম্বি অনুশীলনে হাঁটুতে চোট পেয়ে ছিটকে যান। ফলে আক্রমণে তাদের ধার কিছুটা কমে যায়। অন্যদিকে কলম্বিয়া বরাবরের মতোই আক্রমণের মূল ভরসা করে অভিজ্ঞ জেমস রদ্রিগেসকে।
ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামের ছাদ বন্ধ থাকায় ভেতরে গরম ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবু দর্শকদের উৎসাহে কোনও ঘাটতি ছিল না। ৫২ হাজারেরও বেশি দর্শকের বেশিরভাগই ছিলেন কলম্বিয়ার সমর্থক। হলুদ জার্সিতে পুরো গ্যালারি রঙিন হয়ে উঠেছিল। দল বল হারালেই সুইসদের উদ্দেশে শিস, আর আক্রমণে উঠলেই বজ্রধ্বনির মতো সমর্থন—স্টেডিয়ামের পরিবেশ অনেকটাই ব্যারাঙ্কিয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
প্রথম বড় সুযোগ আসে ২১ মিনিটে। মাঝমাঠে জেমস রদ্রিগেসের ভুল স্পর্শ থেকে বল পেয়ে যান জেফারসন লেরমা। তাঁর পাসে বক্সের বাইরে থেকে গুস্তাভো পুয়ের্তার দারুণ বাঁকানো শট উড়ে যাচ্ছিল জালের কোণে। কিন্তু অসাধারণ ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ফিরিয়ে দেন সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল।
নয় মিনিট পর পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে সুইজারল্যান্ড। ড্যানিয়েল মুনিয়োসের ক্লিয়ারেন্স আটকে যায় ড্যান এনদয়ের গায়ে। বল পেয়ে যান ফাবিয়ান রিডার। তাঁর শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন কলম্বিয়ার গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস। কয়েক মিনিট পর এনদয়ের আরেকটি প্রচেষ্টাও অসাধারণ সেভে রুখে দেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিবর্তন আনে সুইজারল্যান্ড। আরডন জাশারির বদলে নামানো হয় জিব্রিল সোকে। মাঠে নেমেই তিনি গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন। এনদয়ের ক্রস থেকে তাঁর শট অল্পের জন্য বার উড়িয়ে যায়।
৬৩ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় সুযোগ নষ্ট করে কলম্বিয়া। সুইস অধিনায়ক গ্রানিত ঝাকার ভুল পাস কেড়ে নেন লুইস সুয়ারেস। সামনে শুধু গোলরক্ষক, কিন্তু তাঁর শট অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। গ্যালারিতে প্রথমে হতাশার নিস্তব্ধতা, তারপরই আবার সমর্থকদের গর্জন।
৬৬ মিনিটে জেমস রদ্রিগেসকে তুলে নামানো হয় হুয়ান কুইন্তেরোকে। অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মাঠ ছাড়ার সময় দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান কলম্বিয়ার সমর্থকেরা। কুইন্তেরো আসার পর আক্রমণে কিছুটা গতি এলেও শেষ পাস কিংবা ফিনিশিংয়ের অভাবে গোলের দেখা মিলছিল না। কখনও থ্রু বল সামান্য বেশি এগিয়ে যাচ্ছে, কখনও অফসাইডে ধরা পড়ছেন ফরোয়ার্ডরা, আবার কখনও সুইস রক্ষণ ভেঙে উঠতে পারছে না কলম্বিয়া।
অতিরিক্ত সময়ে অবশ্য ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। ৯৩ মিনিটে জামিন্তন কামপাস বক্সে ঢুকে পড়ার পর মিরো মুইহাইমের চ্যালেঞ্জে পড়ে যান। কলম্বিয়া জোরালোভাবে পেনাল্টির দাবি জানালেও রেফারি খেলতে বলেন।
৯৮ মিনিটে গোলের এত কাছাকাছি গিয়েও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বঞ্চিত হয় কলম্বিয়া। কুইন্তেরোর নিখুঁত কর্নার থেকে জন লুকুমির শক্তিশালী হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এরপর কামপাসের দূরপাল্লার শটও দারুণ দক্ষতায় বাঁচিয়ে দেন কোবেল।
সুইজারল্যান্ডও অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে ছিল না। বদলি হিসেবে নামা জেকি আমদুনি বক্সের ভেতরে আলগা বল পেয়ে জোরালো শট নেন। কিন্তু কামিলো ভার্গাস নিচু হয়ে অসাধারণ সেভ করে দলকে বাঁচান।
ম্যাচের ১১৬ মিনিটে আবারও সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন কামপাস। প্রায় দশ গজ দূর থেকে সম্পূর্ণ ফাঁকা অবস্থায় তাঁর শট অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। সেই মুহূর্তেই যেন স্পষ্ট হয়ে যায়, এদিন গোল করার ভাগ্য নিয়ে মাঠে নামেনি কলম্বিয়া।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে মানসিক দৃঢ়তায় এগিয়ে থাকে সুইজারল্যান্ড। সুইসরা চারটি শটই সফলভাবে জালে জড়ায়, আর কলম্বিয়া তিনবার সফল হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শট ব্যর্থ হয়। নির্ধারিত হয়ে যায় ম্যাচের ভাগ্য।
ফুটবলে অনেক সময় একটি ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয় একটি সেভ, একটি মিস কিংবা একটি স্নায়ুচাপের মুহূর্ত। এই ম্যাচেও তাই হয়েছে। ১২০ মিনিট ধরে অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে পারেনি কলম্বিয়া। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের অনবদ্য পারফরম্যান্সকে পুঁজি করে ইতিহাস লিখে ফেলল।
এবার তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সেই লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ড কি আরও একটি অঘটন ঘটাতে পারবে, নাকি মেসির জাদুতেই শেষ হবে তাদের রূপকথা—সেটাই এখন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ।