হাইলাইটস:

  • বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অভিনেতা জেসন সুদেইকিস ফুটবলকে বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরবেন।
  • সেই সময়েই বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।
  • সোমালিয়ার বর্ষসেরা রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
  • লেখকের মতে, ট্রাম্পের আমেরিকা বিশ্বকাপকে ব্যবহার করছে নিজের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য।
  • জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ফিফা এই পরিস্থিতিতে কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায়।

বাংলাস্ফিয়ার: শুক্রবার সন্ধ্যা ছ’টার কিছু আগে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে বিশ্বের কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শকের সামনে হাজির হবেন অভিনেতা জেসন সুদেইকিস। তিনি সেই জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র টেড লাসোর ভূমিকায় পরিচিত, যিনি এক কল্পিত ফুটবল দলের ম্যানেজার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর কাজ হবে একটি পরিচিত বার্তা পৌঁছে দেওয়া—ফুটবল বিশ্বকে একত্রিত করে।

কিন্তু এই বার্তাটির মধ্যে এক গভীর বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে।

কারণ যখন সুদেইকিস ঐক্যের কথা বলবেন, তখন বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ আমেরিকা একই সময়ে গ্রুপ জি-র দ্বিতীয় শক্তিশালী দল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানকেও হত্যা করা হয়েছে। ফলে ফুটবল যে বিশ্বকে এক করে—এই বক্তব্য এমন এক মুহূর্তে উচ্চারিত হবে, যখন বিশ্বকাপের আয়োজক দেশই বিশ্বের অন্যতম বড় বিভাজনের উৎস হয়ে উঠেছে।

এই বার্তা হয়তো শুনবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ইতিমধ্যেই ছয়টি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর কড়া অভিবাসন নীতির ফলে আফ্রিকার বর্ষসেরা ফুটবল রেফারি সোমালিয়ার ওমর আরতানকে বিশ্বকাপে আসার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

ইনফান্তিনো ও ফুটবলের ‘মহাজাগতিক ঐক্য’

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও বারবার বলে থাকেন যে ফুটবল বিশ্বকে একত্রিত করে। তাঁর প্রিয় ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফিতে ল্যাটিন ভাষার মতো শোনানো একটি বাক্যও খোদাই করা রয়েছে—“পেডিলুডুস কোনিউঙ্গিত মুন্ডুম”, অর্থাৎ ফুটবল পৃথিবীকে এক করে।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, ইনফান্তিনো এখন আর বিশ্বফুটবলের মানবতাবাদী দূত নন। বরং তিনি এমন এক প্রশাসক, যিনি ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করেন। সোমালি রেফারির প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধার মুখে পড়া ৩৯টি ফিফা সদস্য দেশের নাগরিকদের দুর্ভোগ—এসব নিয়ে তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা নেই বলেই মনে হয়।

তবু অনুষ্ঠান চলবে। ঐক্যের কথা বলা হবে। দর্শকরা আবেগে ভাসবেন। আর সেই সময় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানবিক বিপর্যয় চলতেই থাকবে।

আমেরিকান ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর নতুন অধ্যায়

বিশ্বকাপের শুরুতেই লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—আমরা কি এখন আমেরিকান স্পোর্টসওয়াশিংয়ের যুগে প্রবেশ করেছি?

কাতার বিশ্বকাপকে ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল প্রবল। রাশিয়ার বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও স্বৈরতন্ত্রের প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এবারের ঘটনা ভিন্ন।

এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ এমন একটি দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যে দেশ একই সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাত এবং একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

তবু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বাস্তবতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে তেমন কোনও জোরালো বিতর্ক নেই।

কাতার অন্তত নিজের সীমাবদ্ধতা আড়াল করার চেষ্টা করেনি। রাশিয়াও পূর্ণাঙ্গ ইউক্রেন আক্রমণের আগে কয়েক বছর অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু এবার টেলিভিশনের রিমোট হাতে নিলেই এক চ্যানেলে বিশ্বকাপ, অন্য চ্যানেলে যুদ্ধের সরাসরি সম্প্রচার দেখা যাচ্ছে।

হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

এই বিশ্বকাপ অন্যরকমও হতে পারত।

আমেরিকার অভিবাসী সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ফুটবল অত্যন্ত জনপ্রিয়। পরপর দুই বছর ফিফার বৃহৎ টুর্নামেন্ট আয়োজন দেশটিকে আরও সংহত, বহুসাংস্কৃতিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারত।

কিন্তু ট্রাম্প ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।

তিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে আরও ক্ষমতাশালী করেছেন এবং জাতি ও অভিবাসন নিয়ে বিভাজনমূলক রাজনৈতিক ভাষ্যকে উৎসাহিত করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে সোমালি রেফারির প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা কোনও প্রশাসনিক ভুল নয় বলে মনে করেন লেখক। এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা—ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের বোঝাতে চাইছেন যে বাইরের পৃথিবীই আসল শত্রু।

বিচ্ছিন্নতাবাদের ভেতর ও বাইরে

আমেরিকার ভেতরে এই বিচ্ছিন্নতাবাদ অভিবাসনবিরোধী নীতির রূপ নেয়।

বাইরে তা প্রকাশ পায় একতরফা সামরিক অভিযানে।

এই কারণেই লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরান দলের উপস্থিতি এত অদ্ভুত ও নাটকীয়। যে দেশ বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে, সেই দেশের ওপরই হামলা চালাচ্ছে অন্যতম আয়োজক দেশ।

সমস্যা শুধু ভিসা বা যাতায়াতের নয়।

সমস্যা হল, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়তে পারে প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে।

বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, জেট ফুয়েল ও ডিজেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলি ইতিমধ্যেই রেশনিং ও বাড়ি থেকে কাজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

অর্থাৎ সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়; তা বিশ্বব্যাপী।

যুদ্ধ কি আমেরিকার অর্থনৈতিক কৌশল?

লেখক আরও একটি বিতর্কিত যুক্তি তুলে ধরেছেন।

তাঁর মতে, ট্রাম্পের আমেরিকার বিচ্ছিন্নতাবাদ নিছক আবেগ বা উন্মাদনা নয়; এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক কৌশল।

ইরানে হামলার ফলে বিশ্বের বহু দেশ জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে। কিন্তু আমেরিকা নিজেই এখন বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। শেল তেল ও গ্যাস উৎপাদনের কারণে অন্যদের তুলনায় তারা অনেক বেশি সুরক্ষিত।

ফলে বিশ্ব যখন মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাবে, তখন আমেরিকা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ যেন ট্রাম্পের বাড়ির উঠোনে আয়োজিত এক বিশাল উৎসব, যেখানে বিশ্বের মানুষ আনন্দ করছে, অথচ আয়োজকের কর্মকাণ্ড নিয়ে তেমন প্রশ্ন তুলছে না।

ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় জুয়া

সমালোচকদের মতে, এই বিশ্বকাপই হতে পারে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জুয়া।

এটি তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, তাঁর প্রশাসনিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তাঁর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের উদাহরণও হতে পারে।

ইনফান্তিনো ফিফাকে প্রায় নিজের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন। তিনি শুধু সভাপতি নন, তিনি যেন ফিফার মুখপাত্র, প্রচারক এবং প্রতীক—সবকিছু।

কিন্তু এবার তিনি এমন এক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন, যা বিশ্বের বড় অংশের কাছে বিভাজন, জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃত্ববাদের প্রতীক। তিনি স্থানীয় আয়োজক কমিটি ছাড়াই বিশ্বকাপ পরিচালনা করছেন। ট্রাম্পপন্থী রাজনীতিক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানির মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন।

ফুটবল কাতারকে টিকে থাকতে দেখেছে। রাশিয়াকেও অতিক্রম করেছে। এই বিশ্বকাপও হয়তো শেষ পর্যন্ত সফল হবে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে—ফুটবলকে আর কত দূর পর্যন্ত টেনে নেওয়া যায়? মানুষের ভালোবাসা, আস্থা এবং আবেগকে কতবার রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে বিনিময় করা যায়?

সম্ভবত ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই প্রশ্নেরই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।