সুমন নামা

মুকুল ঝরে গেল অবশেষে

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছেন, যাঁদের উপস্থিতি প্রকাশ্য মঞ্চে যতটা, অন্তরালে তার চেয়েও বেশি।
  • মুকুল রায় সেই অন্তরালের পরিসরের মানুষদের একজন।
  • তাঁর প্রকাশ‍্য অবতারে উল্লেখ করার মতো প্রায় কিছুই ছিলনা, মুকুলের শিক্ষা সীমিত, জনসভার বক্তা হিসেবে নেহাতই মামুলি, সাংসদ হিসেবে রেকর্ড অতীব অনুজ্জ্বল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছেন, যাঁদের উপস্থিতি প্রকাশ্য মঞ্চে যতটা, অন্তরালে তার চেয়েও বেশি। মুকুল রায় সেই অন্তরালের পরিসরের মানুষদের একজন। তাঁর প্রকাশ‍্য অবতারে উল্লেখ করার মতো প্রায় কিছুই ছিলনা, মুকুলের শিক্ষা সীমিত, জনসভার বক্তা হিসেবে নেহাতই মামুলি, সাংসদ হিসেবে রেকর্ড অতীব অনুজ্জ্বল। মুকুলের বৈশিষ্ট‍্য ছিল অন‍্যত্র, যেখানে সফল হওয়াটাও রাজনীতিতে খুবই কঠিন। আমি বলব মুকুল ছিলেন রাজনৈতিক যন্ত্রকৌশলের নির্মাতা—সংগঠন, সমীকরণ, দরকষাকষি ও যোগাযোগের নিঃশব্দ স্থপতি। তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একজন নেতার অবসান নয়, এটি এক বিশেষ রাজনৈতিক শৈলীর প্রস্থান।

১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া মুকুল রায়ের রাজনৈতিক উত্থানে দীর্ঘদিন চোখে পড়ার মতো কিছু ছিলনা। মধ্য-চল্লিশে পৌঁছনর পরে, নব্বই দশকের শেষভাগে মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় যখন কংগ্রেস ত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ বাঁধার তোড়জোড় শুরু করলেন, মুকুল তখনই আমাদের নজর কাড়তে শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজে মুকুল রায়ের ভূমিকা ছিল মৌলিক। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি জেলা থেকে ব্লক, ব্লক থেকে বুথ- প্রতিটি স্তরে নীরবে ব‍্যক্তিগত সম্পর্ক আর সাংগঠনিক জাল বুনেছিলেন। রাজনীতির প্রকাশ্য উত্তাপের আড়ালে যে শীতল সংগঠনগত পরিশ্রম থাকে, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন মুকুল রায়।

২০০৯ সালে তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পান। দিল্লির করিডরে তাঁর উপস্থিতি ছিল সংযত, প্রায় অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর। তিনি জানতেন কোন দরজায় কড়া নাড়তে হয়, কোন সময়ে নীরব থাকতে হয়, আর কখন চাপ প্রয়োগ করতে হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহাসিক জয়ের অন্তরালে (যে জয় ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটায়) সংগঠনের যে সুদৃঢ় কাঠামো প্রয়োজন ছিল, তা নির্মাণে মুকুলের অবদান সাক্ষাৎ বিশ্বকর্মার মতো। এরপর থেকেই সবাই তাঁকে চিনতে শুরু করে দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে। তৃণমূলের মতো দলে যেখানে নেত্রীর আচরণ অনেকটা লন্ডনের আবহাওয়ার মতো সেখানে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছন এবং দীর্ঘদিন তা রক্ষা করতে পারার জন‍্য বিরল প্রায় নির্বিকল্প ধাতুতে গড়া হতে হয়।মুকুল যে সেটা অনায়াসে আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন সেটাই তাঁর বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ‍্য মাইলফলক।

মুকুল যা পেয়েছিলেন তা কারও দয়ার দান ছিলনা, একশ শতাংশ স্ব-অর্জিত।বরফের মতো ঠান্ডা মাথা, ওষ্ঠে দুর্বোধ‍্য হাসি, গোপনীয়তা রক্ষার দুর্লভ ক্ষমতা, কাজের কর্মীকে চিহ্নিত করার চোখ সর্বোপরি অহোরাত্র দলের কাজে ঘাম ঝরানোর ইচ্ছা মুকুলকে ওই জায়গায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর মতো পরিণত বুদ্ধির মানুষও যে বিষয়টি অবজ্ঞা করেছিলেন অথবা বুঝতে পারেননি বা বোঝার চেষ্টাই করেননি তা হোল যে ব‍্যক্তিমালাধীন কোম্পানির জন‍্য তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি তার শেয়ার হোল্ডার ছিলেননা, তিনি নেহাতই এক নন-এক্গজিকিউটিভ ডিরেক্টর। ফলে উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি যখন ধীরে ধীরে সামনে আসতে শুরু করল, কত ধানে কত চাল হয় মুকুল তা বুঝতে শুরু করেছিলেন।২০১৪ সালে হঠাৎ করে নেত্রীর ভ্রাতুষ্পুত্রের মর্তভূমে আবির্ভাব হোল, এক ঝটকায় বদলে যেতে শুরু করল পুরোনো সব সমীকরণ। তথাকথিত নতুন প্রজন্মের উত্থান, বিশেষত অভিষেক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের দ্রুত প্রতিষ্ঠায় নেত্রীর নীরব অথচ স্পষ্ট সমর্থন দলের অন্দরে নেত্রীর ঠিক নীচে দ্বিতীয় আর একটি ক্ষমতার কেন্দ্রের জন্ম বুঝিয়ে দিল মুকুলের একা কুম্ভ হয়ে দলে ছড়ি ঘোরানোর দিন আর খুব বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার নয়, এক্সপায়ারি ডেট দ্রুত এগিয়ে আসছে।

এতৎসত্ত্বেও মুকুল হয়ত আরও কিছুদিন সসম্মানে টিকে যেতে পারতেন যদিনা তাঁর নাম একই সঙ্গে সারদার মতো বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ত। জীবনের সেই চরম সঙ্কটের মুহূর্তে মমতার সমর্থন মুকুল পাননি। সেদিনই মুকুল বুঝে গিয়েছিলেন হাজতবাস এড়াতে হলে নিজের হাতে তৈরি চাষের ক্ষেত তাঁকে ছেড়ে চলে যেতেই হবে।
মুকুলের সঙ্গে আমার তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলনা, যদিও বন্ধুত্ব ছিল, তার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস। সমূহ সঙ্কটের ওই দিনগুলিতে মুকুল কেন জানিনা আমাকে বিশ্বাস করে অনেক কথা বলত, হয়ত মনটা কিছুটা হাল্কা করবে বলেই।তখনই আমি বুঝেছিলাম রাজনীতিতে অন্তরালের সেনাধ‍্যক্ষেরা আসলে খড়ের পুতুল, নিরাপদ বৃত্তের মধ‍্যে তাঁরা খবর্দারি করতে পারেন, সূর্য়ালোকের তলায় দাঁড়িয়ে জীবনের কঠিনতম চ‍্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার মতো স্নায়ু তাঁদের থাকেনা। অন্তত মুকুল রায়ের তো ছিলই না।
সঙ্কটের মুখোমুখি না হয়ে পরিত্রাণকে বেছেছিলেন মুকুল। আমার মতে সেদিনই রাজনৈতিক মৃত‍্যু হয়েছিল মুকুলের। তারপর বিজেপিতে গিয়ে মুকুল যাই করে থাকুননা কেন সেটা ভাড়াটে সেনার কাজ, তাতে না ছিল কোনও ঔজ্জ্বল‍্য না গৌরব। এক ধাক্কায় রাজ‍্য-রাজনীতির শিরোণাম থেকে মুকুল নিজেই নিজেকে নির্বাসিত করেছিলেন পাদ-টিকায়।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles