হাইলাইটস:

  • পেশায় চিকিৎসক, রাজনীতিতে চারবারের সাংসদ—কাকলি ঘোষ দস্তিদার একসময় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠতম সহযোগীদের অন্যতম।
  • ১৯৯০-এর দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার পর চিকিৎসায় যুক্ত থাকার ঘটনা তাঁকে দলের অন্দরে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
  • আজ সেই কাকলিই তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং লোকসভায় আলাদা গোষ্ঠীর স্বীকৃতির দাবিতে সামনের সারিতে রয়েছেন।
  • বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, প্রায় ২০ জন সাংসদ তাঁদের সঙ্গে আছেন এবং তাঁরা এনডিএকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।

বাংলাস্ফিয়ার: একসময় তিনি ছিলেন ‘দিদির ডাক্তার’। আজ তিনি ‘দিদির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’-এর মুখ। তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকম্পে যে নামটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তা হল কাকলি ঘোষ দস্তিদার।

উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের এই সাংসদকে দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের নির্ভরযোগ্য মুখ বলে মনে করা হতো। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল আগেই। আর রাজনীতিতে তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজনদের একজন। দলীয় মহলে এখনও স্মরণ করা হয় সেই সময়ের কথা, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী রাজনীতির উত্তাল দিনগুলোতে একাধিকবার শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। চিকিৎসক কাকলি তখন তাঁর চিকিৎসা ও পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রেই দু’জনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছিল।

কাকলির রাজনৈতিক উত্থানও কম নাটকীয় নয়। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে তৃণমূলে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহিলা মুখে পরিণত হন। ২০০৯ সালে প্রথমবার বারাসত থেকে লোকসভায় জয়ী হন। তারপর থেকে টানা চারবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন লোকসভায় দলের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

কিন্তু রাজনীতির সমীকরণ বদলাতে সময় লাগে না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর থেকেই দলের অন্দরে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। সেই ক্ষোভই এখন প্রকাশ্য বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। আর সেই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সংগঠক কাকলি ঘোষ দস্তিদার।

বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের প্রায় ২০ জন সাংসদ তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। তাঁরা স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। এই পুরো প্রক্রিয়ার মুখপাত্র হিসেবে উঠে এসেছেন কাকলি।

দলের ভিতরে তাঁর অবস্থান কতটা বদলে গেছে, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিও। কাকলি প্রথমে দলীয় সাংগঠনিক পদ ছাড়েন। পরে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে দলেরই এক শীর্ষ সাংসদ তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। সেই অভিযোগ নিয়ে তিনি সরাসরি লোকসভার স্পিকারকে চিঠিও লেখেন।

বিদ্রোহের জেরে কাকলিকে এখন তৃণমূলের আনুগত্যশীল শিবিরের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হয়েছে, বিজেপির সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু কাকলি পিছু হটেননি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এই লড়াই ব্যক্তিগত নয়; পশ্চিমবঙ্গের শাসনব্যবস্থা এবং দলের গত কয়েক বছরের পরিচালনা নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কাকলির বিদ্রোহের গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় নয়, প্রতীকে। কারণ তিনি কোনও প্রান্তিক নেতা নন। তিনি সেই প্রজন্মের তৃণমূল নেতা, যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংগ্রামের দিনগুলো থেকে তাঁর পাশে ছিলেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে হওয়া বিদ্রোহকে অনেকেই তৃণমূলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন।

রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হয়তো এটাই—যে চিকিৎসক একদিন নেত্রীর ক্ষত সারিয়েছিলেন, আজ তিনিই তাঁর রাজনৈতিক ক্ষতের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছেন। বাংলার রাজনীতিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই রূপান্তর তাই নিছক দলবদলের গল্প নয়; এটি ক্ষমতা, আনুগত্য, বিশ্বাস এবং বিদ্রোহের এক বিরল রাজনৈতিক উপাখ্যান।