হাইলাইটস:
- বিদ্রোহী শিবির কলকাতায় তৃণমূলের রাজ্য সংগঠন দফতরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে।
- দফতরের তালা বদলানো হয় এবং নতুন নেতৃত্বের নামে ব্যানার টাঙানো হয়েছে।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অনুগত শিবির ঘটনাকে বেআইনি দখল বলে অভিযোগ করেছে।
- প্রগতি ময়দান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
- ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী, যাতে কোনও সংঘর্ষ না ঘটে।
- দলীয় প্রতীক, সংগঠন এবং সম্পদের দাবিকে ঘিরে সংঘাত এখন আরও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতায় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সংগঠন দফতরকে ঘিরে শুক্রবার নজিরবিহীন রাজনৈতিক নাটকের সাক্ষী থাকল রাজ্য। বিদ্রোহী শিবির হঠাৎ করেই দফতরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে। দফতরের তালা বদলানো হয়, বাইরে নতুন ব্যানার টাঙানো হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে ভবিষ্যতে সেখান থেকেই সংগঠনের কাজ পরিচালিত হবে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের দাবি, তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছে। তাদের বক্তব্য, দলীয় সাংগঠনিক প্রক্রিয়া মেনেই নতুন নেতৃত্ব গঠিত হয়েছে এবং সেই কারণেই সংগঠনের দফতরে কাজ করার অধিকার তাদের রয়েছে। দফতরের বাইরে টাঙানো ব্যানারে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের নতুন বিন্যাসও তুলে ধরা হয়।
এই পদক্ষেপের পরই পাল্টা সক্রিয় হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অনুগত শিবির। তাদের অভিযোগ, জোর করে দফতর দখল করা হয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। শিবিরের নেতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও নতুন তালা লাগানো থাকায় তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে প্রগতি ময়দান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া দলীয় সম্পত্তিতে প্রবেশ, তালা পরিবর্তন এবং সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হয়েছে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় কলকাতা পুলিশ। নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়। দুই পক্ষের সমর্থকদের মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয় বলে প্রশাসন সূত্রের খবর। কয়েক ঘণ্টা ধরে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়েছে কারণ এর মাত্র একদিন আগেই বিদ্রোহী শিবির নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হয়ে দলীয় নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক বৈধতার দাবি জানিয়েছিল। কমিশনের কাছে তারা নিজেদেরই প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে মমতা শিবিরের বক্তব্য, বহিষ্কৃত বা বিদ্রোহী নেতাদের এমন দাবি করার কোনও সাংগঠনিক বা আইনি ভিত্তি নেই।
দলীয় দফতরকে ঘিরে এই সংঘাত আসলে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়। প্রথমে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বন্দ্ব, তারপর সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এবং এখন দলীয় কার্যালয় দখলের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত আর কেবল নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দলীয় পরিচয়, সাংগঠনিক কাঠামো এবং সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ভবনের মালিকপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমঝোতার ভিত্তিতেই তারা দফতরের দায়িত্ব নিয়েছে। অপরদিকে মমতা-অনুগত নেতাদের দাবি, তাদের সঙ্গে বৈধ চুক্তির মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি এবং সেই অবস্থায় অন্য কারও দখল নেওয়া আইনসম্মত হতে পারে না। এই বিরোধের নিষ্পত্তি আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
মমতা শিবির ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা শুধু পুলিশের দ্বারস্থই হবে না, প্রয়োজনে আদালতেরও শরণাপন্ন হবে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি—দুই স্তরেই লড়াই চলবে।
অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের অবস্থানে অনড়। তাদের দাবি, সংগঠনের প্রকৃত সমর্থন তাদের পক্ষেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সমস্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম এই দফতর থেকেই পরিচালিত হবে। ফলে দলীয় প্রতীক ও সংগঠনের বৈধতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের শুনানির পাশাপাশি এখন রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তৃণমূলের এই রাজ্য দফতর।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে দুই পক্ষকে নিজেদের দাবি ও নথি পেশ করতে হবে, অন্যদিকে দফতর দখল এবং পুলিশি অভিযোগের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় এগোতে পারে। এই দুই প্রক্রিয়ার ফলাফলই নির্ধারণ করতে পারে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতির পরবর্তী সমীকরণ।