হাইলাইটস:
- ইডির তলবের একদিন পর বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরে যোগ দিলেন মদন মিত্র।
- বিধানসভায় বিদ্রোহী শিবিরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
- ‘ঘর বদলেছি, এখন তৃণমূল কংগ্রেসেই আছি’— ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য মদনের।
- বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিধায়কের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা।
- মদনের এই পদক্ষেপে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহী শিবিরকে তীব্র আক্রমণ করে তাঁদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছেন
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন জল্পনার জন্ম দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা মদন মিত্র। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর তলবের ঠিক একদিন পরই তিনি বিধানসভায় গিয়ে বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর তাঁর একটি মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে— “আমি ঘর বদলেছি। এখনও আমি তৃণমূল কংগ্রেসেই আছি।”
মদনের এই বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে রসিকতা হলেও রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্দরে চলা টানাপোড়েন, একের পর এক বিধায়ক ও সাংসদের বিদ্রোহী শিবিরে যোগদান এবং নেতৃত্ব নিয়ে সংঘাতের আবহে তাঁর এই মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মদন মিত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিধায়কের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। সেখানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের ভবিষ্যৎ এবং বিরোধী রাজনীতির কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মদন বলেন, তিনি ‘ঘর বদলেছেন’, কিন্তু দল বদলাননি। তাঁর দাবি, তিনি এখনও ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’-এর সঙ্গেই রয়েছেন।
এই বক্তব্যকে বিদ্রোহী শিবির কার্যত নিজেদের পক্ষে বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, তৃণমূলের প্রকৃত আদর্শ এবং সংগঠনের ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই তারাই করছে, আর মদনের মতো প্রবীণ নেতার উপস্থিতি সেই দাবিকে আরও শক্তিশালী করল।
অন্যদিকে, তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই দিনে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে দল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর কথায়, যারা মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এখন অন্য শিবিরে গিয়েছেন, তারা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে তিনি কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, জনগণই শেষ পর্যন্ত তাদের জবাব দেবে।
মদন মিত্র অতীতেও একাধিকবার বিতর্কিত বা ব্যতিক্রমী মন্তব্য করে শিরোনামে এসেছেন। তবে এবার তাঁর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের পরিচিত মুখ এবং দলের সাংগঠনিক ও জনভিত্তির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে তাঁর মতো একজন নেতার বিদ্রোহী শিবিরে যাওয়া প্রতীকী দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সময়টিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ইডি তাঁকে তলব করেছে। সেই তলবের পরদিনই তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে। যদিও মদন মিত্র স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তদন্ত এবং তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি দাবি করেন, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, মদন মিত্রের মতো অভিজ্ঞ নেতার আগমন তাদের আন্দোলনে নতুন গতি দেবে। আগামী দিনে আরও কয়েকজন প্রবীণ নেতা তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের একাংশের বক্তব্য, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে দল দুর্বল হয় না। বরং মানুষের সমর্থনই দলের আসল শক্তি। বিদ্রোহীদের নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই তারা দাবি করেছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘটনাটি কেবল একজন নেতার অবস্থান পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক মাসে তৃণমূলের অভ্যন্তরে যে বিভাজন ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে, মদন মিত্রের এই পদক্ষেপ সেই সংকটকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এল। বিশেষ করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবির নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, সেখানে মদনের মতো পরিচিত মুখের উপস্থিতি তাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।
আগামী দিনে আরও কোনও নেতা এই পথ অনুসরণ করেন কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। একদিকে ইডি-সহ কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার চাপ, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন— এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।