সুশাসনের ধারণা বোঝাতে রামরাজ্য, রাজধর্ম ও সেঙ্গোলের পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিকে সামনে আনছে এনসিইআরটি। নবম শ্রেণির নতুন সমাজবিজ্ঞান বইয়ের ‘গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’ অধ্যায়ে প্রাচীন ভারতীয় শাসনচিন্তার সঙ্গে আধুনিক গণতন্ত্র ও জননীতি প্রণয়নের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’ বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের এই অধ্যায়ে পড়ুয়ারা জানবে শাসনের ঐতিহ্য, নীতি তৈরির প্রক্রিয়া এবং তা কার্যকর করার বিভিন্ন দিক।

মঙ্গলবার প্রকাশিত ১৫৩ পাতার বইটির চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে এই আলোচনা। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভূগোল ও অর্থনীতির পৃথক বইয়ের আগের ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সমন্বিত পাঠ্যবইয়ে বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য একটি করে অধ্যায় রাখা হয়েছে। শাসনব্যবস্থার বিবর্তন বোঝাতে সভা ও সমিতি থেকে সংবিধানভিত্তিক গণতন্ত্র এবং নাগরিক অংশগ্রহণ পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরা হয়েছে।

রামরাজ্যের প্রসঙ্গে বইয়ে মহাত্মা গান্ধীর চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের ব্যাখ্যা, গান্ধী যে আদর্শ শাসনব্যবস্থা কল্পনা করেছিলেন, তার ভিত ছিল সততা, স্বচ্ছতা, সহমর্মিতা, জনকল্যাণ এবং মানুষকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ। রামায়ণ ও ষোড়শ শতকের রামচরিতমানসে বর্ণিত রামরাজ্যের সঙ্গে এই ধারণার যোগ দেখানো হয়েছে। বইয়ের বক্তব্য, ভারতীয়দের দীর্ঘদিনের সমষ্টিগত কল্পনায় রামরাজ্য সুশাসন ও সুন্দর সামাজিক জীবনের অন্যতম আদর্শ উদাহরণ।

একই আলোচনায় এসেছে মহাভারতের রাজধর্ম। শাসকের দায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে, ক্ষমতা প্রয়োগের বাইরেও শাসনের একটি নৈতিক দায় রয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ সেই দায়িত্বের অংশ। জাতীয় মূলমন্ত্র ‘সত্যমেব জয়তে’-র উৎস হিসেবে মুণ্ডক উপনিষদ এবং সুপ্রিম কোর্টের মূলমন্ত্রের উৎস হিসেবে মহাভারতের উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহ্যের এই মূল্যবোধ আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে কীভাবে স্থান পেয়েছে, সেটিও আলোচ্য। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি স্বাধীন ভারতের শাসনব্যবস্থায় দেশীয় ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রভাবও ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই পাঠে।

সেঙ্গোলকে বইয়ে শাসনক্ষমতা ও সুশাসনের সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। পাঠ্যবই অনুযায়ী, ন্যায়নিষ্ঠ শাসনের চিহ্ন হিসেবে এই রাজদণ্ড ব্যবহারের ঐতিহ্য চোল যুগের। স্বাধীনতার সময়ে তামিলনাড়ুর আধীনম সাধুদের কাছ থেকে জওহরলাল নেহরুর সেঙ্গোল গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নতুন সংসদ ভবনে সেটি স্থাপন করেন। এই বিবরণও ভারতীয় শাসনচিন্তার ধারাবাহিকতার আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।

সমকালীন জননীতি বোঝাতে জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২০-কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও জনসাধারণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নীতি তৈরির উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে সেটিকে উপস্থাপন করেছে বই। বলা হয়েছে, প্রস্তুতিপর্বে আড়াই লক্ষ গ্রাম পঞ্চায়েত, ৬,৬০০ ব্লক, ৬,০০০ শহুরে স্থানীয় সংস্থা এবং ৬৭৬ জেলার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছিল। প্রায় দু’লক্ষ প্রস্তাব আসে; নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের একাধিক সুপারিশ চূড়ান্ত নীতিতে জায়গা পায়।

নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের প্রয়োজন বোঝাতে এসেছে ‘খেলো ভারত নীতি, ২০২৫’। রাজ্য, জেলা, স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল, প্রশিক্ষক, পরিবার ও খেলোয়াড়দের মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, ২০১৭, আয়ুষ্মান ভারত এবং ই-গভর্ন্যান্সেরও উল্লেখ রয়েছে। বইয়ের অন্যান্য আলোচনায় স্টার্টআপ ইন্ডিয়া, আত্মনির্ভর ভারত, বিকশিত ভারত ২০৪৭, স্বচ্ছ ভারত, পিএম পোষণ, ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও জল জীবন মিশনের মতো কর্মসূচি জায়গা পেয়েছে।

তবে জাতীয় শিক্ষানীতির এই ইতিবাচক উপস্থাপনার পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। তামিলনাড়ু ও কেরলসহ বিভিন্ন রাজ্য নীতিটির বিরোধিতা করেছে; কেন্দ্রের সঙ্গে বাস্তবায়ন নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারণে পরামর্শের দাবি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ঐকমত্যকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। অধ্যায়টি আরও বলছে, সুশাসনের দায়িত্ব সরকারের একার নয়; নাগরিক, জনপ্রতিনিধি, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি ক্ষেত্রেরও ভূমিকা আছে। জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।