দেশের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে নতুন করে তীব্র হয়ে উঠল রাজনৈতিক উত্তাপ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করার চরমসীমা বেঁধে দিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে হুঁশিয়ারি দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিইসি পদত্যাগ না করলে গোটা দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু হবে, এবং শেষমেশ দিল্লিতে হবে ‘জন্তর মন্তর ২.০’। ওই সাংবাদিক বৈঠকে দীপকের পাশে ছিলেন দলের সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস এবং মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা।

অভিযোগের কেন্দ্রে ‘এসইআর’

সিজেপি-র এই আক্রমণের মূল কারণ নির্বাচন কমিশনের চলতি ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসইআর প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। সিজেপি-র দাবি, দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে তেরো কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে, যাকে তারা ভোটাধিকার হরণের সুপরিকল্পিত প্রয়াস বলে চিহ্নিত করছে। সাংবাদিক সম্মেলনে দীপক অভিযোগ করেন, গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই ‘কারচুপি’ করা হয়েছে এবং সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার কার্যত কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি আক্রমণ করে তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার দেশের সবচেয়ে বড় বিপজ্জনক ব্যক্তি, যিনি ভারতের গণতন্ত্রের প্রতি সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন, এবং তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। দীপকের প্রশ্ন, গণতন্ত্র মানে তো ছিল জনগণ সরকার বেছে নেবে; কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার সিইসি হওয়ার পর থেকে সরকারই ঠিক করে দিচ্ছে কে ভোট দিতে পারবে আর কে পারবে না।

তিন দফা দাবি

সিজেপি-র তরফে মূলত তিনটি দাবি তোলা হয়েছে। প্রথমত, জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ। দ্বিতীয়ত, সিইসি-র বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করে স্পষ্ট করা হোক, তাঁকে কার নির্দেশে কাজ করতে হয়েছে। তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভোটার তালিকা পুনর্বহাল করা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন বাতিল করা। এর পাশাপাশি এসইআর প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্থগিতাদেশ এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনগুলি পিছিয়ে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে দলটি।

দীপক জানিয়ে দেন, চরমসীমা পেরিয়ে গেলে দেশজুড়ে বিক্ষোভের রূপরেখা দলের তরফে শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে, এবং শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান-বিক্ষোভে বসার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে। তাঁর কথায়, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁরা পিছু হটবেন না। বিরোধী দলগুলির উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে কারচুপি হচ্ছে জেনেও যদি কোনও দল ভোটে অংশ নেয়, তা হলে তাদের একটা অবস্থান নিতেই হবে— নীরব থাকার সুযোগ নেই।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট

সিজেপি-র এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার দু’পর্বের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, যেখানে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী এসইআর সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে লিখিত আপত্তিপত্র জমা দিয়েছিলেন তিন সদস্যের কমিশনের অভ্যন্তরে। এই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পরই কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়, এবং তারই জেরে সিজেপি নতুন করে আক্রমণ শানায়।

দলটি এবার তাদের প্রচার-প্রচেষ্টাকে ‘ইলেকশন কমিশন ঠিক করো’ নামে একটি পৃথক কর্মসূচির রূপ দিয়েছে, যার কেন্দ্রে থাকছে নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন।

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান

অন্য দিকে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিইসি পদের দায়িত্ব নেন এবং এখনও সেই পদেই বহাল আছেন। কমিশনের বক্তব্য, এসইআর প্রক্রিয়ার লক্ষ্য সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতাবলে যোগ্য নাগরিকদের তালিকাভুক্ত করা এবং অযোগ্যদের বাদ দেওয়া, যাতে ভোটার তালিকা নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হয়। বর্তমানে এই এসইআর প্রক্রিয়া দেশের ১৬টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চলছে। সিজেপি ছাড়াও অন্য একাধিক বিরোধী দল এসইআর প্রক্রিয়ার সময়, পদ্ধতি ও বাদ পড়া নামের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।

সব মিলিয়ে এসইআর প্রক্রিয়া এবং সিইসি-র ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক যে আপাতত থামছে না, তা স্পষ্ট। ৪৮ ঘণ্টার চরমসীমা পেরনোর পর সিজেপি প্রকৃতপক্ষে কী পদক্ষেপ নেয় এবং নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের কী জবাব দেয়— আগামী কয়েক দিনে সেটাই হয়ে উঠবে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।