Table of Contents
হাইলাইটস:
- ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকা ও ইরান শান্তিচুক্তির দোরগোড়ায়; সেই কারণেই নির্ধারিত হামলা বাতিল।
- তেহরান পাল্টা জানিয়েছে, এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
- হরমুজ প্রণালী, জব্দ সম্পদ মুক্তি ও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বড় মতপার্থক্য অটুট।
- কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্পের অবস্থান পূর্ণ বিপরীত—আগে তেল অবকাঠামো দখলের হুমকি, পরে সমঝোতার সুর।
- মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত; কুয়েত, বাহরিন ও জর্ডানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
বাংলাস্ফিয়ার: দুই দিন ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলার পর যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছিল, ঠিক তখনই নাটকীয় ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং সেই কারণেই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাতিল করেছেন।
ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, আলোচনার বিষয়টি ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছে এবং সেখানে অনুমোদনও মিলেছে। সেই কারণেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ওই রাতের নির্ধারিত হামলা ও বোমাবর্ষণ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণা সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ হোয়াইট হাউস দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির চেষ্টা চালিয়ে আসছে, কিন্তু ট্রাম্প অতীতেও বহুবার দাবি করেছেন যে চুক্তি প্রায় হয়ে গেছে, যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের বক্তব্য কার্যত খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আলোচনার খসড়ার বড় অংশ চূড়ান্ত হলেও ইরান তার ‘লাল দাগ’ বা মৌলিক অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসবে না।
বাঘাইয়ের কথায়, “এখনও পর্যন্ত ইরান কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।”
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা তাসনিম আরও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সমঝোতার ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের বক্তব্য গুরুত্ব দেওয়ার কারণ নেই।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কূটনীতিক জানিয়েছেন, মূল চুক্তির অধিকাংশ অংশই কয়েক সপ্তাহ আগেই প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখনও তা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ।
তার ভাষায়, “চুক্তি নষ্ট করে দিতে পারে এমন বহু পক্ষ রয়েছে।”
কী রয়েছে সম্ভাব্য চুক্তিতে?
আলোচনায় থাকা খসড়া অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে পাতা মাইন অপসারণের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। সেই সময় পর্যন্ত মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।
এছাড়া ভবিষ্যতের পরমাণু আলোচনা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে একটি কাঠামো তৈরির কথাও রয়েছে। তবে কীভাবে এবং কোন পদ্ধতিতে এই অর্থ ছাড় করা হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
কিন্তু ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে দাবি করে চলেছেন যে চুক্তি কার্যত সম্পন্ন।
হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, “চুক্তি সই হলেই হরমুজ প্রণালী খুলে যাবে। সেটা খুব শিগগিরই হতে পারে—হয়তো এই সপ্তাহান্তেই, ইউরোপে।”
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই আলোচনা সম্পর্কে ইজরায়েল, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, তুরস্ক ও পাকিস্তান অবহিত এবং তারা এতে সম্মতি জানিয়েছে।
ইজরায়েলের সতর্ক সমর্থন
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, তার কোনও পক্ষ নয় ইজরায়েল।
তবে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, কারণ তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে চূড়ান্ত চুক্তিতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন বন্ধ করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সমস্যা হলো, অতীতেও এই তিনটি বিষয়ই ইরানের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল।
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থান
ট্রাম্পের অবস্থানের নাটকীয় পরিবর্তন আরও বিস্ময়কর কারণ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি ইরানের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো দখলের হুমকি দিয়েছিলেন।
ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই রাতেই ইরানকে “খুব কঠোরভাবে” আঘাত করবে। তাঁর দাবি ছিল, ইরানের আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে পারস্য উপসাগরের খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও আমেরিকা নিয়ে নেবে।
খার্গ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনা করে এবং সেখানে বিশাল তেল সংরক্ষণাগার রয়েছে।
ট্রাম্প লিখেছিলেন, “আমরা খার্গ দ্বীপ এবং অন্যান্য তেল অবকাঠামো দখল করব এবং তাদের তেল ও গ্যাস বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেব, যেমনটা আমরা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করেছি।”
কিন্তু পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেই অবস্থান অনেকটাই নরম করেন। তিনি বলেন, খার্গ দ্বীপ দখল তাঁর পছন্দের বিকল্প হলেও আমেরিকা আদৌ তার জন্য প্রস্তুত কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ব্যাপারেও তিনি এখন আগ্রহী নন।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দুই দেশকেই এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন করে সহিংসতা শুরু হলে সংঘাত আবার পূর্ণমাত্রায় ফিরে আসতে পারে এবং তার ফল পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হবে।
খার্গ দখল মানে স্থলযুদ্ধ
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপ দখল করতে হলে আমেরিকাকে স্থলবাহিনী নামাতে হবে।
মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ও সাবেক মেরিন কর্মকর্তা রুবেন গালেগো বলেছেন, এতে মার্কিন সেনাদের জীবন ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাঁর মতে, খার্গ একটি ছোট ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেখানে মোতায়েন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করা ইরানের জন্য খুব কঠিন হবে না।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প যদি কোনও ‘অপরিকল্পিত পদক্ষেপ’ নেন, তবে তার জবাব হবে আরও শক্তিশালী এবং আরও বেদনাদায়ক।
তিন ভারতীয় নাবিক নিহত
গত দুই দিন ধরে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনার ওপর ব্যাপক হামলা চালায়।
একই সময়ে মার্কিন সেনাবাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালায়। তাদের দাবি, জাহাজটি ইরানি বন্দরগুলির ওপর আরোপিত অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল। হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ওই হামলা চালানো হয়।
ভারতের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। তবে সেটি একই জাহাজ কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
উপসাগর জুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইরান বৃহস্পতিবারও কুয়েত, বাহরিন এবং জর্ডানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে।
বাহরিনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি ১১ বছরের মেয়ে আহত হয়েছে। আকাশে প্রতিরোধ করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাড়িঘর ও গাড়িরও ক্ষতি হয়েছে।
তবুও পর্দার আড়ালে আলোচনা থেমে নেই। রয়টার্সকে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদানপ্রদান আরও জোরদার হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা রয়ে গেছে বিদেশে আটকে থাকা কয়েকশো কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করা। ইরান চায় পুরো অর্থ একসঙ্গে তেহরানের হাতে তুলে দেওয়া হোক। আমেরিকা চায় ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় করতে এবং তা মানবিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করতে।
এক ইরানি সূত্রের ভাষায়, “সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধ অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। আমেরিকা হামলা চালিয়ে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে।”
হরমুজ ও পরমাণু কর্মসূচিই মূল প্রশ্ন
ট্রাম্প চান ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া বন্ধ করুক এবং ভবিষ্যতে কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন নিশ্চয়তা দিক।
অন্যদিকে তেহরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
বুধবারের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করেছে। আন্তর্জাতিক জাহাজগুলিকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়েছে।
তবে মার্কিন সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং তাদের কোনও জাহাজও আক্রান্ত হয়নি।
রাজনৈতিক চাপে ট্রাম্প
এই সংঘাত এমন এক সময়ে চলছে যখন আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। ট্রাম্পকে সামনে রাখতে হবে মধ্যবর্তী নির্বাচন, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তার প্রশ্ন।
সিনেটর গালেগোর মন্তব্য, “এত সহজ নয় বিষয়টা। নিজের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করা উচিত নয়। ট্রাম্প এই বিষয়ে অত্যন্ত হালকাভাবে কথা বলছেন।”
ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাগুলি চললেও কূটনৈতিক টেবিলে এখন সমান তালে চলছে দরকষাকষি। শান্তিচুক্তি হবে কি না, তার উত্তর এখনও অজানা। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজ, তেল, পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার রাজনীতিকে ঘিরে আমেরিকা ও ইরানের এই সংঘাত এখনও শেষ হওয়ার অনেক বাকি।