Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তিনি নিজেই নিজের গল্পের প্রধান চরিত্র, প্রধান বর্ণনাকারী এবং অনেক সময় প্রধান সম্পাদকও। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে বাস্তব পরিস্থিতি ট্রাম্পের বর্ণিত কাহিনির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
যুদ্ধের শুরু থেকে ট্রাম্প বারবার ইরানকে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বারংবার দাবি করেছেন যে তেহরান খুব শিগগিরই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে এবং একটি শান্তিচুক্তি সই হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনও চুক্তি হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প অন্তত ৩৮ বার বলেছেন যে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা “খুব কাছাকাছি”। কিন্তু প্রতিবারই সেই আশ্বাস মিলিয়ে গেছে নতুন কোনও হুমকি বা সামরিক উত্তেজনার মধ্যে।
বিজয়ের দাবি, বাস্তবে অচলাবস্থা
আমেরিকা ইতিমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে “সম্পূর্ণ বিজয়” অর্জনের দাবি করেছে। ট্রাম্প নিজেও সেই দাবি করেছেন। সাংবাদিকরা যখন এই হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তখন তিনি তাদের আক্রমণ করেছেন। অথচ বাস্তবতা হল, হরমুজ প্রণালী এখনও বন্ধ রয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন সেই কারণে বাধাগ্রস্ত।
এই বৈপরীত্যই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সংকট। একদিকে তিনি বলছেন ইরান কার্যত পরাজিত, অন্যদিকে আবার ইরানের অনমনীয় মনোভাবকে শান্তিচুক্তি না হওয়ার কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
সোমবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের দাদাগিরি শেষ। তারা আলোচনায় আসতে খুব বেশি সময় নিয়েছে। এখন তাদের মূল্য দিতে হবে।” কিন্তু এই মন্তব্যের কিছুক্ষণ আগেই ওমান উপকূলের কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। মার্কিন প্রশাসন এর জন্য ইরানকে দায়ী করেছে।
ঘটনাটি বিশেষভাবে অস্বস্তিকর, কারণ এর আগে ট্রাম্প এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে ইরানের কাছে কার্যকর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা রাডার ব্যবস্থা নেই। বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্য অন্য কথা বলছে।
হামলা চলছেই, সমাধান নেই
ইরান এখনও কুয়েত, বাহরিন এবং জর্ডানে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ২০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, যার মধ্যে রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিও ছিল।
বুধবার ওভাল অফিসে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প আবারও একই সঙ্গে হুমকি ও আশ্বাসের দ্বৈত বার্তা দিলেন। তিনি বললেন, “আজ আমরা আবার কঠোর আঘাত হানব। তারপর দেখা যাবে চুক্তির কী হয়। আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি, কিন্তু তারা আমাদের নিয়ে খেলছে।”
এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। একদিন বলা হচ্ছে শান্তি খুব কাছে, পরের দিন বলা হচ্ছে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবার তার পরদিন নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
রাজনৈতিকভাবে এই কৌশল ট্রাম্পকে সংবাদ শিরোনামের কেন্দ্রে রাখছে। কিন্তু এর মূল্যও দিতে হচ্ছে। ধীরে ধীরে তাঁর ঘোষণাগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় হচ্ছে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি যুদ্ধ ও মানবজীবনের মতো গুরুতর প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। অন্যান্য রাষ্ট্রনেতারাও যেন এই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটকে কাজে লাগাতে শুরু করেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা না চালাতে বলবেন। কিন্তু ইজরায়েল পরে হামলা চালায়। এরপর ট্রাম্প ব্যাখ্যা দেন যে তখন নাকি ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যেই ছোড়া হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি আবার দাবি করেন, নেতানিয়াহু তাঁর নির্দেশ অমান্য করেননি। বরং বলেন, “আমি যখন ওকে কিছু করতে বলি, তখন সে তা-ই করে।”
হুমকি যখন ফাঁকা আওয়াজ হয়ে যায়
একই রকম পরিস্থিতি দেখা গেছে ইরানের ক্ষেত্রেও। ট্রাম্প বারবার ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনায় বড় আকারের হামলার হুমকি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই এই ধরনের পরিকল্পনাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত তিনি কূটনীতির দিকে ফিরে গেছেন অথবা নতুন কোনও সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন — দুই সপ্তাহ, আরও কিছুদিন, আরেক দফা আলোচনা। তারপর সেই সময়সীমা নীরবে হারিয়ে গেছে।
বুধবার ফক্স নিউজ জানায় যে ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হামলার দিকে এগোচ্ছেন। এই ধরনের হামলা ইরানের অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে। কিন্তু তাতেও হরমুজ প্রণালী খুলবে বা ইরান শান্তির জন্য আত্মসমর্পণ করবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এক ধরনের কৌশলগত অচলাবস্থায় আটকে পড়েছে। সামরিক শক্তিতে তারা স্পষ্টতই এগিয়ে, কিন্তু সেই শক্তিকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করতে পারছে না। আলোচনার টেবিলে কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রমাণও নেই। বরং পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট ও আকস্মিক ঘোষণার উপর।
ইরানের পাল্টা বার্তা
অন্যদিকে ইরানও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পথে হাঁটবে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লিখেছেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর আমেরিকা আমাদের সংকল্প পরীক্ষা করার চেষ্টা করছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কোনও হামলা বা হুমকির জবাব না দিয়ে ছেড়ে দেবে না। নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে যান।”
ফলে আপাতত যে চিত্রটি ফুটে উঠছে তা হল — হুমকি, পাল্টা হামলা, আলোচনার ইঙ্গিত, আবার নতুন হুমকি। এই চক্র বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। আর সেই চক্রের কেন্দ্রে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি এখনও নিজের বর্ণিত গল্পটিকেই বাস্তব বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করছে, গল্প আর বাস্তব এক জিনিস নয়।