বেলগ্রেডের রাস্তায় সোমবার আবার হাজার কয়েক মানুষ হাঁটলেন, হাততালি দিলেন, স্লোগান তুললেন। তবে এ বার মিছিলের গন্তব্য শুধু কোনও সরকারি ভবন বা প্রতিবাদস্থল ছিল না। সার্বিয়ার প্রায় দু’বছরের ছাত্র-আন্দোলনের প্রতিনিধিরা ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের কাছে তাঁদের প্রার্থী-তালিকা জমা দিয়েছেন। ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদ নির্বাচনে ‘স্টুডেন্টস উইন’ নামের আন্দোলন এখন সরাসরি ক্ষমতাসীন শিবিরের বিরুদ্ধে লড়বে।

আন্দোলনের সূত্র ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে পড়া। ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নির্মাণ ও সংস্কারকাজের নথি, ঠিকাদারি এবং সরকারি জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্ররা মনে করেন, দুর্ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কারিগরি ব্যর্থতা নয়; দুর্নীতি, গোপনীয়তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলির দুর্বলতার ফল। অবরোধ, পদযাত্রা ও বিশাল সমাবেশের মধ্য দিয়ে সেই দাবি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়।

নির্বাচনী তালিকায় শুধু বর্তমান ছাত্রদের রাখা হয়নি। শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত ব্যক্তিকে প্রার্থী করা হয়েছে। আন্দোলনের বক্তব্য, তাঁদের উদ্দেশ্য প্রচলিত অর্থে আর একটি দল তৈরি করা নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা, দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং অবাধ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দল নিজেদের পৃথক প্রার্থী না দিয়ে ছাত্র-সমর্থিত তালিকাকে জায়গা ছেড়েছে।

তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন আলেকসান্দার ভুচিচ—গত বারো বছর ধরে কখনও প্রধানমন্ত্রী, কখনও প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২৭ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়বেন এবং ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রচার চালিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন। তাঁর বক্তব্য, ছাত্র-আন্দোলনের স্পষ্ট প্রশাসনিক কর্মসূচি নেই এবং বিদেশি স্বার্থ তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। আন্দোলনকারীরা সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এই নির্বাচনে ছাত্রদের একটি অস্বাভাবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। আন্দোলনের শক্তি আসে বিকেন্দ্রীকরণ ও সরাসরি সভা থেকে; নির্বাচনে দরকার একক তালিকা, প্রার্থী বাছাই, প্রচারের অর্থ এবং অসংখ্য বাস্তব বিষয়ে নির্দিষ্ট অবস্থান। স্লোগানের নৈতিক স্পষ্টতা কর, কৃষি, বিদেশনীতি বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সিদ্ধান্তে আপনাআপনি রূপান্তরিত হয় না। ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘ সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও গণমাধ্যমে প্রভাবও বড় বাধা।

অন্য দিকে ভুচিচের জন্যও এটি সাধারণ বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে নির্বাচন নয়। ছাত্ররা বহু মাস ধরে শহরের বাইরেও পায়ে হেঁটে ও সাইকেলে গিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের মুখে পুরনো দলের পরিচিত নেতারা নেই। ফলে সরকার শুধু বিরোধীদের অতীত ব্যর্থতা দেখিয়ে সমালোচনা ঠেকাতে পারবে না; নোভি সাদের মৃত্যুগুলি এবং তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন বারবার ফিরে আসবে।

রাস্তার আন্দোলন নির্বাচনে নামলেই তার সাফল্য নিশ্চিত হয় না। ভোটের নিয়ম প্রতিবাদের নিয়মের থেকে আলাদা এবং ক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজনে আপস করতেই হয়। তবু প্রার্থী-তালিকা জমা দেওয়ার ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ছাত্রেরা ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে কেবল নৈতিক চাপ তৈরির বদলে সেই ব্যবস্থার ভিতরে নিজেদের পরীক্ষা করাতে রাজি হয়েছেন।

২৫ অক্টোবরের ফল যাই হোক, সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রজন্মগত একটি দরজা খুলেছে। ২০২৪ সালের একটি ভেঙে পড়া ছাউনি থেকে শুরু হওয়া প্রশ্ন এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। ব্যালটপত্র তাদের ক্ষোভকে সরকারে পৌঁছে দেবে কি না জানা নেই; কিন্তু ছাত্রেরা অন্তত প্রমাণ করেছেন, দীর্ঘ প্রতিবাদের পরের বাক্যটি শুধু আর একটি মিছিলও হতে হবে না।