Table of Contents
হাইলাইটস:
- ইতিহাসের বৃহত্তম শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশ করল স্পেসএক্স।
- প্রথম দিনের লেনদেনেই সংস্থার বাজারমূল্য ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল।
- বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হলেন ইলন মাস্ক।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান।
- বিপুল মূল্যায়ন ও লোকসানের কারণে উদ্বেগও বাড়ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় পঁচিশ বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করে অবশেষে শেয়ারবাজারে পা রাখল ইলন মাস্কের মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্স। আর সেই আত্মপ্রকাশই হয়ে উঠল বিশ্ব আর্থিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। প্রথম দিনের লেনদেন শেষ হওয়ার আগেই সংস্থার বাজারমূল্য ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে ফেলে। সেই সঙ্গে স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান।
একসময় ক্যালিফোর্নিয়ার এল সেগুন্দোর একটি গুদামঘরে শুরু হওয়া সংস্থাটি আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি ও মহাকাশ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির দিনটিকে অনেকেই প্রযুক্তি শিল্পের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গুদামঘর থেকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য
স্পেসএক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০২ সালে। সেই সময় মহাকাশ গবেষণা ও বাণিজ্যিক রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলির একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। মাস্কের লক্ষ্য ছিল সেই কাঠামো ভেঙে বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে মহাকাশে প্রবেশকে সহজ ও সস্তা করা।
প্রথম দিকে একের পর এক ব্যর্থ উৎক্ষেপণ, অর্থসংকট এবং দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও সংস্থাটি টিকে যায়। পরে ফ্যালকন-৯ রকেট, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি এবং স্টারলিংক উপগ্রহ নেটওয়ার্কের সাফল্য স্পেসএক্সকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
আজ সংস্থাটি শুধু রকেট নির্মাতা নয়। স্টারলিংক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা এক্সএআই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এবং মহাকাশ পরিবহণ প্রযুক্তি সব মিলিয়ে এটি এক বিশাল প্রযুক্তি কংগ্লোমারেটে পরিণত হয়েছে।
প্রথম দিনেই রেকর্ড
শেয়ারবাজারে প্রবেশের আগে স্পেসএক্স প্রতি শেয়ারের মূল্য ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু লেনদেন শুরু হয় ১৫০ ডলারে। দিনের মধ্যে শেয়ারের দাম ১৭৬ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।
বাজার বন্ধ হওয়ার সময় শেয়ার প্রতি মূল্য দাঁড়ায় ১৬০ ডলার। অর্থাৎ প্রথম দিনেই প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি। ফলে সংস্থার মূল্যায়ন ২.১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়, যা ইতিহাসে কোনও নতুন তালিকাভুক্ত সংস্থার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।
নিউইয়র্কের নাসডাক এক্সচেঞ্জে ঘণ্টা বাজিয়ে লেনদেনের সূচনা করেন স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল। সেই সময় পটভূমিতে বাজছিল এলটন জনের বিখ্যাত গান রকেট ম্যান।
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার
স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানা অংশীদারিত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে সংস্থার মূল্যায়ন আকাশছোঁয়া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণও বিস্ফোরক হারে বেড়ে যায়।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বাজার বন্ধের সময় ইলন মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার। এর আগে বিশ্বের কোনও ব্যক্তির সম্পদ এক ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেনি।
মাস্কের সম্পদের উৎস শুধু স্পেসএক্স নয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলায় তাঁর বিপুল অংশীদারিত্বের মূল্যই প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার বিপুল মূল্যায়ন।
মহাকাশ নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা?
স্পেসএক্সকে অনেকে এখনও মূলত মহাকাশ সংস্থা হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এর বর্তমান মূল্যায়নের বড় অংশ নির্ভর করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনার উপর।
সম্প্রতি মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা এক্সএআই স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত হয়েছে। ফলে স্পেসএক্স এখন কেবল রকেট উৎক্ষেপণকারী সংস্থা নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপগ্রহ যোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সমন্বিত শক্তি।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পেসএক্সের এই বিপুল মূল্যায়নের পেছনে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার উপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কাজ করেছে। বর্তমান আয় বা লাভের তুলনায় সংস্থার মূল্য অনেক বেশি।
লাভ নয়, তবু আকাশছোঁয়া মূল্য
এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
গত বছরে স্পেসএক্সের মোট আয় ছিল ১৮.৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু একই সময়ে সংস্থাটি ৪.৩ বিলিয়ন ডলারের পরিচালন ক্ষতির মুখে পড়ে।
তুলনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটার আয় ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং নিট লাভ ৬০ বিলিয়ন ডলারের উপরে।
অর্থাৎ স্পেসএক্স এখনও লাভজনক নয়। তবু তার বাজারমূল্য বিশ্বের বহু পুরনো ও লাভজনক সংস্থাকে ছাপিয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিকে অনেকে নব্বইয়ের দশকের ডটকম বুদ্বুদের সঙ্গে তুলনা করছেন। আবার অন্যদের মতে, এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অবকাঠামোর উপর বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বাজি।
অস্বাভাবিক আইপিও
স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশের পদ্ধতিও ছিল ব্যতিক্রমী।
সাধারণত কোনও সংস্থা শেয়ারের একটি মূল্যসীমা ঘোষণা করে এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ভিত্তিতে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ হয়। কিন্তু স্পেসএক্স কার্যত “নাও অথবা ছেড়ে দাও” ধরনের মূল্য নির্ধারণ করে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৩৫ ডলারের নির্দিষ্ট মূল্য ঘোষণা করা হয়। ফলে বাজারে প্রবল উৎসাহের ভিত্তিতেই শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।
খবর অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা প্রস্তাবিত শেয়ারের তুলনায় চার গুণ বেশি ছিল।
সমালোচনাও বাড়ছে
এই বিপুল উচ্ছ্বাসের মধ্যেও উদ্বেগের সুর শোনা যাচ্ছে।
মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন অভিযোগ করেছেন, সংস্থার মূল্যায়ন ও হিসাবনিকাশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আইপিও স্থগিত রাখার আবেদনও জানিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি উদ্বেগ হল সংস্থার ওপর মাস্কের অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ। স্পেসএক্সের ভোটাধিকারযুক্ত শেয়ারের প্রায় ৮৫ শতাংশ তাঁর হাতে। ফলে কার্যত পুরো সংস্থাই একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নির্মাণে এক্সএআই যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তাও ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন অনেকে।
নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান
এই আইপিওকে শুধু একটি কোম্পানির সাফল্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর পুঁজির নতুন যুগের প্রতীক।
স্পেসএক্সের পরে ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকও শেয়ারবাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের মূল্যায়নও ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান।
ফলে বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ারবাজার ক্রমশ কয়েকটি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
গণতন্ত্র বনাম অতিধন
ফরাসি অর্থনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান এই ঘটনাকে কেবল আর্থিক নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
তাঁর মতে, একদিকে গণতন্ত্র, অন্যদিকে অতি-বিশাল ব্যক্তিগত সম্পদ—এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক টানাপোড়েন রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মনে করা হয়েছিল যে চরম সম্পদকেন্দ্রিক অর্থনীতি অতীতের বিষয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ নতুন করে অতিধনীদের জন্ম দিচ্ছে।
স্পেসএক্সের আইপিও সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করল।
মহাকাশের স্বপ্ন, নাকি নতুন অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য?
ইলন মাস্ক বারবার বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য মানবসভ্যতাকে বহু-গ্রহে বিস্তৃত করা। মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন তাঁর দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন। স্পেসএক্সের আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ সেই স্বপ্নপূরণের পথ আরও প্রশস্ত করবে বলেই তাঁর দাবি।
তবে সমালোচকদের প্রশ্নও কম নয়। মহাকাশে মানব উপনিবেশ গঠনের স্বপ্নের আড়ালে কি বিশ্বের অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরও কয়েকজন প্রযুক্তি সম্রাটের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে?
শুক্রবারের ঐতিহাসিক আইপিও সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই—স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশ শুধু একটি আর্থিক ঘটনা নয়, একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি, পুঁজি ও ক্ষমতার সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার মুহূর্ত।