Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৫ সালের ১২ জুন আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটি উড়তে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি মেডিক্যাল কলেজের উপর ভেঙে পড়ে। বিমানের ২৪২ জন যাত্রীর মধ্যে ২৪১ জনই প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১৬৯ জন ভারতীয় এবং ৫২ জন ব্রিটিশ নাগরিক। দুর্ঘটনাস্থলে থাকা আরও ১৯ জন মারা যান এবং ৬৭ জন গুরুতর আহত হন।
সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা একমাত্র যাত্রী ব্রিটিশ নাগরিক বিশ্বাশ কুমার রমেশ। দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তিতে তিনি আবারও প্রশ্ন তুলেছেন — সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? কেন ঘটেছিল? আর কেন এখনও সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি?
শারীরিকভাবে বেঁচে, মানসিকভাবে এখনও আহত
বিশ্বাশ নিজে বেঁচে গেলেও সেই দুর্ঘটনায় তাঁর ভাইকে হারিয়েছেন। সংবাদ সংস্থা প্রেস অ্যাসোসিয়েশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি এখনও গভীর মানসিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছি। আমার ভাইকে হারিয়েছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এখনও জানি না কেন এই দুর্ঘটনা ঘটল।”
আগে নিজের বেঁচে যাওয়াকে ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে বর্ণনা করলেও এখন তাঁর বক্তব্য একটাই — অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও যন্ত্রণার শেষ নেই।
তিনি আরও বলেন, “এই প্রশ্নগুলো শুধু আমার নয়, প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের। যা ঘটেছে তা আর বদলানো যাবে না, কিন্তু পরিবারগুলোর সত্য জানার অধিকার রয়েছে।”
তদন্ত রিপোর্ট এখনও অপ্রকাশিত
দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মাথায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটি প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, উড্ডয়নের পরপরই বিমানের দুই ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী ‘ফুয়েল সুইচ’ দু’টি হঠাৎ ‘কাট-অফ’ অবস্থায় চলে যায়, ফলে ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে বিমানটি দ্রুত শক্তি হারায়। কিন্তু কীভাবে বা কেন এই সুইচগুলো সেই অবস্থায় গেল, তার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
গত মাসে ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীর মধ্যেই রিপোর্ট ‘প্রায় সম্পূর্ণ’ হয়ে যাবে। কিন্তু বার্ষিকী এসে গেলেও চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি।
আর্থিক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার অভিযোগ
বিশ্বাশের প্রতিনিধি সঞ্জীব প্যাটেল জানিয়েছেন, এয়ার ইন্ডিয়ার কাছ থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ২১,৫০০ পাউন্ড আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন বিশ্বাশ, যা তাঁর স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের সন্তানের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার প্রভাব এতটাই গভীর যে তিনি এখনও স্বাভাবিকভাবে কাজে ফিরতে পারেননি।
প্যাটেল বলেন, “বিশ্বাশের পরিবার বর্তমানে মাসে এক হাজার পাউন্ডেরও কম আয়ে জীবনযাপন করছে। আর্থিক, মানসিক এবং আবেগগত — সব দিক থেকেই তারা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বারবার এয়ার ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরোধ জানানো হলেও তা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি এয়ার ইন্ডিয়া এবং টাটা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে। আলোচনা ইতিবাচক ছিল এবং কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান প্যাটেল, তবে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
বিশ্বাশ ইতিমধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পথে হেঁটেছেন। তাঁর আইনজীবীরা সম্ভাব্য একাধিক পক্ষের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হাডগেল সলিসিটরসের আইনজীবী পল ম্যাকক্লোরি বলেন, “আমরা তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় আছি। আশা করছি খুব শিগগিরই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কীভাবে এটি এড়ানো যেত, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।”
ব্রিটিশ সরকারের নীরবতা
সঞ্জীব প্যাটেল আরও অভিযোগ করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনাগুলোর একটির শিকার হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বাশ বা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সরাসরি কোনো বিশেষ সহায়তা পাননি। এ বিষয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এক বছর পেরিয়ে গেছে। তদন্ত প্রায় শেষ বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু নিহতদের পরিবার এবং একমাত্র জীবিত যাত্রী বিশ্বাশ কুমার রমেশের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও একই — সেই দিন আকাশে ঠিক কী ঘটেছিল? উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের অপেক্ষারও শেষ নেই।