Home খবর ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি ভাঙার আশঙ্কা: হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে ফের জ্বলল পশ্চিম এশিয়া

ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি ভাঙার আশঙ্কা: হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে ফের জ্বলল পশ্চিম এশিয়া

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 7 views 4 minutes read
A+A-
Reset

এটি একটি সদ‍্য হাতে পাওয়া প্রতিবেদন। ঘটনা যেমন যেমন গড়াবে আমরা সেভাবে আপডেট করতে থাকব

হাইলাইটস

  • লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইজরায়েলি হামলার পর ইরান সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
  • এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল।
  • তেহরান, তাবরিজ ও ইসফাহানে পাল্টা ইজরায়েলি হামলার খবর মিলেছে।
  • ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
  • নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েছে এবং তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন যে এখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি, রবিবার গভীর রাতের ঘটনাবলি তা আবারও স্পষ্ট করে দিল। মাত্র কয়েক মাস আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, সেটি এখন কার্যত নতুন পরীক্ষার মুখে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইজরায়েলের এক বড়সড় হামলার জেরে ইরান সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জবাব দিয়েছে। এর পরপরই ইজরায়েলও ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।

ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা অনেক পর্যবেক্ষকের মতে ফেব্রুয়ারি-মার্চের পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে।

রবিবার রাত প্রায় ১১টার দিকে ইজরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির সামরিক বাহিনী জানায়, ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ভূপাতিত করা হলেও নাগরিকদের জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়।

কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনার পর ইজরায়েলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করে যে পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সাধারণ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বেরোতে পারেন। তবুও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সারা দেশে সোমবার স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই হামলার দায় স্বীকার করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইজরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

আইআরজিসি আরও দাবি করে, এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে যে যুদ্ধবিরতিতে তারা সম্মত হয়েছিল, তার অন্যতম শর্ত ছিল “সমস্ত ফ্রন্টে” সামরিক অভিযান বন্ধ রাখা। ইজরায়েল সেই শর্ত ভঙ্গ করেছে বলেই তেহরান মনে করছে।

বিবৃতিতে কড়া ভাষায় বলা হয়, “আজকের অভিযান ছিল একটি সতর্কবার্তা। আগ্রাসন পুনরাবৃত্তি হলে প্রতিক্রিয়া আরও বিস্তৃত ও কঠোর হবে।”

ইরানের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, তেহরান এখন হিজবুল্লাহকে কেবল একটি মিত্র গোষ্ঠী নয়, বরং নিজের প্রতিরক্ষা বলয়ের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে। ফলে লেবাননে ইজরায়েলি অভিযানকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে হামলার সমতুল্য মনে করছে।

অন্যদিকে ইজরায়েলও অপেক্ষা করেনি। সোমবার ভোরের দিকে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায় যে তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী তেহরান, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ এবং মধ্যাঞ্চলের ইসফাহানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ইজরায়েলের দিকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সতর্কবার্তা আসে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইজরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-কে ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়া না জানাতে বলার পরিকল্পনা করেছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এমনকি বলেছেন, “সিদ্ধান্ত আমিই নিই। তিনি নন।”

এই মন্তব্য মার্কিন-ইজরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অস্বাভাবিক বার্তা বহন করে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইজরায়েলের সামরিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টতই যুদ্ধের পুনরুত্থান ঠেকাতে চাইছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন যে বৈরুতে ইজরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়নি এবং তিনি এতে “খুশি নন”।

ইরানের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল আরও সরাসরি—“তোমরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছ, এবার যথেষ্ট হয়েছে। আলোচনার টেবিলে ফিরে আসো এবং একটি চুক্তি করো।”

তবে বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। গত সপ্তাহেই ইজরায়েল ও লেবানন সরকার নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহ সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের মতে, এই সমঝোতা কার্যত আত্মসমর্পণের সমান।

ফলে সীমান্ত অঞ্চলে সংঘর্ষ চলতেই থাকে।

মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে ৩,৬০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও কয়েকশো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে ইজরায়েলের অন্তত ৩০ জন সেনা নিহত হয়েছে।

ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগামী নির্বাচনের আগে জনমত সমীক্ষায় পিছিয়ে থাকা নেতানিয়াহু উত্তর ইজরায়েলের বাসিন্দাদের প্রবল চাপের মুখে রয়েছেন। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর রকেট, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে।

সেই কারণেই নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে হিজবুল্লাহ যদি আবার হামলা চালায়, তাহলে বৈরুতেও বড় আকারের আঘাত হানা হবে।

এদিকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২.৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫.৭৯ ডলারে পৌঁছেছে।

এর কারণ স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারির যুদ্ধের সময় ইরান কার্যত Strait of Hormuz-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

ব্রিটেন ও কানাডা ইতিমধ্যেই দুই পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে চলমান শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি কি শুধুই সীমিত প্রতিশোধমূলক হামলা, নাকি এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটিয়ে পশ্চিম এশিয়াকে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার সূচনা? সেই উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে রবিবার রাতের ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় প্রমাণ করে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে থাকলেও শান্তি এখনও অত্যন্ত ভঙ্গুর।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles