Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার:পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন আর শুধুমাত্র দলত্যাগ, বহিষ্কার বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দলের বিদ্রোহী অংশের মধ্যেও নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন করে মতভেদ সামনে আসতে শুরু করেছে। আর সেই মতভেদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির প্রথম দিকে দাবি করেছিল, তারা তৃণমূলের মূল আদর্শকে বাঁচাতে এবং দলের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শিবিরের ভিতরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা আসলে কী?
একটি অংশের বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধুমাত্র ‘উপদেষ্টা’ বা ‘মরাল অথরিটি’ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তিনি এখনও সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছেন। অর্থাৎ প্রকাশ্যে যতই নতুন নেতৃত্বের কথা বলা হোক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁর অনুমোদন ছাড়া কিছুই হচ্ছে না।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিদ্রোহী শিবিরের অভ্যন্তরে অস্বস্তি বাড়তে শুরু করেছে। কারণ বিদ্রোহের অন্যতম যুক্তিই ছিল পুরনো নেতৃত্বের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি সমস্ত ক্ষমতা আবার একই ব্যক্তির চারপাশে আবর্তিত হয়, তাহলে সেই বিদ্রোহের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
দুই পক্ষের দুই যুক্তি
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিতর্ক আসলে ক্ষমতার বৈধতা এবং নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা — দুই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিদ্রোহী শিবিরের অনেক নেতা মনে করছেন, জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে নতুন মুখ এবং নতুন সাংগঠনিক সংস্কৃতি প্রয়োজন। অন্যদিকে আরেকটি অংশের যুক্তি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও বাংলার রাজনীতিতে সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ। ফলে তাঁকে পুরোপুরি সরিয়ে রেখে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের একাংশ মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। কিন্তু সেই পরামর্শদাতা ভূমিকা যদি কার্যত নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকায় পরিণত হয়, তাহলে নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে মমতা-ঘনিষ্ঠ অংশের পাল্টা যুক্তি, দল যখন একাধিক আইনি, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্বের হাতে সব দায়িত্ব তুলে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
আসল প্রশ্ন কাঠামো নিয়ে
প্রশ্নটা আর শুধু ব্যক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে নয়। প্রশ্নটা হচ্ছে, বিদ্রোহী শিবির আদৌ কী ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে চায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে এই বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। বিদ্রোহী শিবিরকে এখন সাংগঠনিক রূপরেখা, নেতৃত্বের স্তরবিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। সেখানে দ্বৈত ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারণা তৈরি হলে সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নজর রাখছে বিজেপিও
বিজেপিও পরিস্থিতির দিকে কৌতূহল নিয়ে নজর রাখছে। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন যত গভীর হবে, বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক সুবিধা তত বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নে প্রকাশ্য সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও পড়বে।
সব মিলিয়ে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাইরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং নিজেদের ভিতরের ঐক্য রক্ষা করা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শুধু উপদেষ্টা’ নাকি এখনও প্রকৃত সিদ্ধান্তদাতা — এই বিতর্ক সেই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিফলন। আগামী দিনে এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে, বিদ্রোহী শিবির একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি পুরনো ক্ষমতার ছায়া থেকে বেরোতে না পেরে নতুন অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে পড়বে।